Below Post Ad

সাপের তেল

নদী থেকে সরে এসে গাছে ঝুলতে থাকা শটগানটা তুলে কাধে ঝোলালো নাথান । দুহাতে মেয়েটিকে উঁচু করে ধরে নিয়ে গ্রামের দিকে রওনা হল সে। যেভাবেই হোক তাদেরকে বোঝাতে হবে আসলে কি ঘটেছে। আর এটা করতে হবে নাথান আর টামা উভয়ের ভালর জন্যই।




সামনেই ইন্ডিয়ানদের গ্রাম-যেটাকে নাথান নিজের বাড়ি বললে সেটা এখন মরণস্তব্ধ । প্রতি পদক্ষেপেই ব্যাথায় কুঁচকে উঠছে সে। চারপাশের সবকিছু যেন মৃত, শান্ত হয়ে গেছে। এমনকি সবসময় চলতে থাকা বানরের চিকার চেঁচামেচি, পাখির ডাক সবকিছুই কেমন থেমে গেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাস্তার একটা বাঁক ঘুরতেই পথরোধ করে থাকা ডিয়ানদের সামনে পড়ে গেল সে। তীর-বর্শা এমনভাবে তা করা যেন সেগুলো কেবল চুড়তে বাকি। নড়াচড়ার শব্দ থেকে যতটা বুঝতে পারলো তার থেকেও বেশি ইন্ডিয়ানদের উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে নাথান তার পেছনে।

ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের সৈন্যগুলো একটু দেখে নিল নাথান । বোধহয় সবাই চলে এসেছে যুদ্ধ করতে প্রস্তুতিও দারুশ! সবাই যার যার পজিশনে স্থির হয়ে আছে। সবাই লাল রঙে মুখ রাঙিয়ে ময়দানে হাজির । দু-জনকে বাঁচানোর একটা উপায় দেখতে পাচ্ছে নাথান, একটু অভিনয়, যেটা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার কিন্তু এটা ছাড়া উপায়ই বা কি?

“নারবুশি ইয়াই ইয়াই!” চিৎকার করে বলে উঠলো সে। “আমি আপনাদের কাছে ইনসাফ চাই!”

সকাল ১১:৩৮

সাও গ্যাব্রিয়েল কোচিরিয়ার বাইরে

ম্যানুয়েল অ্যাজভেদো জানে তাকে শিকার করা হচ্ছে। বনের সরু রাস্তা ধরে দৌড়াতেই জাগুয়ারটার মৃদু গুঞ্জন তার কানে এল । স্যারেড ওয়ের খাড়া পাহাড়ি রাস্তায় হোঁচট খেয়ে ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে পড়ে গেল সে। সামনেই জঙ্গলের এক ফাঁক দিয়ে সাও গ্যাব্রিয়েলের একাংশ দেখা যাচ্ছে। ছোট এই মফস্বলটি রিও-নিগ্রো নদীর কোলে দাঁড়িয়ে আছে, আর বিশাল আমাজনের পানি বুকে নিয়ে বয়ে চলেছে উত্তরাঞ্চলের মধ্য দিয়ে ।

চলে এসেছি…বেশ কাছেই চলে এসেছি।

পড়তে পড়তে বেশ খানিকটা নিচে গিয়ে একটা জায়গায় থামতেই পেছনে তাকালো সে। জাগুয়ারটার উপস্থিতি টের পাবার জন্য তার সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ । ডাল-পালা ভাঙার কিংবা ঝরাপাতার মরমর শব্দ.. কিন্তু না। জঙ্গলি-বিড়ালটা কোথাও টিকিটাও প্রকাশ করল না এই আমাজনে। এমনকি জাগুয়ারটির শিকারী গুঞ্জনও থেমে গেছে। এটা সে জানত, শিকারকে দৌড়ের উপর রেখে ক্লান্ত করে দিয়ে এখন চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য খুবই সতর্কতার সাথে এগুচ্ছে ওটা।

মাথা সামান্য একটু উঁচু করে এদিক-সেদিক তাকাল ম্যানুয়েল । ঝিঝি পোকার ডাক আর পাখির কিচিরমিচির শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনলো না ঘাম ঝরছে তার মুখ দিয়ে। একদিকে উত্তেজনা চেপে রাখা অন্যদিকে শ্রবনেন্দ্রিয় সজাগ রাখতে রাখতে অজান্তেই তার একহাত চলে গেল কোমরে গোঁজা ছুরিটার হাতলে । অন্য হাতটিও ব্যস্ত থাকলো অপরপ্রান্তে ঝোলানো ছোট চাবুকটার উপর আঙুল বোলানোর কাজে।

তীক্ষ দৃষ্টি দিয়ে চারপাশটা দেখে নিল ম্যানুয়েল। রাস্তার উভয় দিকে লতা-পাতা আর ঝোঁপঝাড়ে ঢাকা। কোন দিক থেকে আসতে পারে জানোয়ারটা?

একটা ছায়া সরে গেল। গোড়ালিতে ভর করে একটু ঘুরে গুটিসুটি মেরে থাকলো ম্যানুয়েল । জঙ্গলের গভীরতা ভেদ করে কিছু দেখার জন্য মরিয়া তার চোখ দুটো কিন্তু কিছুই দেখতে পেলো না । কাছেই মসৃণ আর ছোপছোপ পশমের একটি ছায়া আবির্ভূত হল। কালো ও কমলা রঙের বাঘটা মাত্র দশ ফুট দূরেই । শিকার ধরার ঠিক আগ মুহূর্তেও প্রস্তুতি হিসেবে কাঁধ উঁচু রেখে মাথা নিচু করে লেজটা এদিক ওদিক নাড়াতে লাগল দুবছর বয়সী কৈশোরে পা দেয়া পুরুষ জাগুয়ারটি।

শুকনো পাতার মরমর শব্দ বেশ ভালভাবেই জানান দিচ্ছে ওটার উপস্থিতি। ম্যানুয়েল আরেকটু গুটিয়ে গেল..শিকারের জন্য প্রস্তুত ওটা । তীক্ষ্ণ দাঁত বের করে ঘরঘর শব্দ করতে করতে জাগুয়ারটা ঝাপিয়ে পড়ল তার উপর।

দীর্ঘকায় জাগুয়ারটা ম্যানুয়েলের উপর পড়তেই দম আটকে এল তার। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো সে। উভয়ে জড়াজড়ি করতে করতে কিছুটা নিচে নেমে এল। গড়িয়ে পড়তেই ম্যানুর হালকা পাতলা দেহটা ছুঁয়ে গেল বাতাস । আমাজনের এই জগৎ ডুবে থাকে সীমাহীন সবুজের সাগরে আবার ভেসে ওঠে তীব্র সূর্যালোকের বন্যায় , শিহরিত হয় বর্ণিল পশম আর বড় দাঁতের ভয়ালদর্শণ প্রাণীদের দ্বারা।

জাগুয়ারটা ম্যানুয়েলকে থাবা দিয়ে জাপটে ধরতেই তার গায়ের খাকি পোশাক বেশ খানিকটা ছিড়ে গেল। খুলে পড়ল একটা পকেট। দাঁত বসিয়ে দিল তার কাঁধে। স্থলভাগের সমস্ত প্রাণীকুলের মধ্যে জাগুয়ার হল দ্বিতীয় শক্ত চোয়ালের অধিকারী, তবে তাসত্ত্বেও এটার দাঁত ম্যানুয়েলের কাঁধের মাংস চেপে ধরা ছাড়া কিছুই করতে পারল না।

বন্য ও সভ্যর এই যুগল গড়াতে গড়াতে তুলনামূলক একটি সমতল জায়গায় এসে থামতেই ম্যানুয়েল নিজেকে জাগুয়ারটার নিচে আবিষ্কার করলো। প্রাণীটা গোঙাতে গোঙাতে শার্টের ওপর কামড় বসানোর চেষ্টা করতেই প্রতিপক্ষের আগুনজুলা চোখের দিকে তীক্ষ দৃষ্টি হানল ম্যানুয়েল।

“তোমার হয়েছে, টর-টর?” মুখ দিয়ে দম ছাড়তে ছাড়তে বলল সে। যে নামে বিশাল বিড়ালটাকে ডাকা হল সেটা মূলত আরাওয়াফ ইন্ডিয়ানরা কোন ভুত বা আত্মাকে বোঝানোর জন্য ব্যবহার করে। কিন্তু যেহেতু বিশাল আকৃতির জাগুয়ারটি জেঁকে বসেছে ম্যানুর বুকের উপর সেহেতু এই নামটা উপযুক্ত মনে না হওয়ার কোন কারণ দেখতে পাচ্ছে না। প্রভুর কণ্ঠ শুনেই জাগুয়ারটা শক্ত করে ধরে থাকা শার্ট হোলকা করে দিয়ে খানিক তাকিয়ে থাকল তার দিকে। তারপর ওটার উষ্ণ অমসৃণ জিহ্বা দিয়ে ম্যানুর কপালের ঘাম চাটতে লাগল।

“আমিও তোমাকে ভালবাসি, সোনা, এবার আমাকে ছাড়া ।”

থাবাটা সরে যেতেই ম্যানুয়েল উঠে দাঁড়াল জামা কাপড়ের বেহাল দশা দেখতে দেখতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। তরুণ জাগুয়ারকে শিকারের প্রশিক্ষণ দেওয়া মানে তার ওয়ার্ডরোবে হেঁড়া কাপড়ের আবর্জনা বেড়ে যাওয়া। কাতরাতে কাতরাতে উঠে দাঁড়িয়ে ম্যানুয়েল তার পেছনে একটা গিট্ট দিল । তার বয়স মাত্র বত্রিশ কিন্তু এই খেলাটার জন্য এই বয়সটাকে বার্ধক্যই বলা যায়। বিড়ালটা পায়ের উপর ভর করে নিজেকে একটু প্রসারিত করল, তারপর শব্দ করে লেজ নাড়াতে নাড়াতে বাতাসে নাক চালিয়ে গন্ধ শুকতে লাগল একেবারে পাক্কা শিকারীর মত। একটু হেসে জাগুয়ারের গলাটা বেধে দিল ম্যানুয়েল। “আজকের শিকার ধরা এ-পর্যন্তই। অনেক দেরি হয়ে গেছে। অফিসে আমার একগাদা রিপোর্ট জমে আছে।”

একটু রাগীসুরে আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত পেছন পেছন হাটা শুরু করল জাগুয়ারটি। বছর দুয়েক আগে নিঃস্ব এই শাবকটিকে বাঁচিয়েছিল ম্যানুয়েল । তখন ওটার বয়স ছিল মাত্র কয়েকদিন। ওর মা মারা পড়ে অবৈধ চামড়া ব্যবসায়ীদের হাতে এটার চামড়া এমনি চড়া দাম যে কালোবাজার চাঙ্গা করে রাখত। সাম্প্রতিক ধারণানুযায়ী, এই গভীর আমাজনের পুরোটাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জাগুয়ারের সংখ্যা পনের হাজারে নেমে এসেছে।প্রাণী সংরক্ষণমূলক কর্মকান্ড সেইসব দরিদ্র, মূর্থ ও বর্বর মানুষদের উপরে প্রভাব ফেলেছিল যারা এইসব প্রাণী বাণিজ্যের সাথে যুক্ত থেকে নিজেদের নূন্যতম চাহিদা মেটাত। তবে সত্যি কথা হল ক্ষুধার্ত পেট একজনের নৈতিকদৃষ্টির পরিধি কমিয়ে দেয়। আর তখন এসব জীবজন্তু বাঁচানোর দায়িত্ববোধ হয়ে পড়ে নিষ্ক্রিয়।

এই সত্যিটা আধা-ইন্ডিয়ান ম্যানুয়েল ভালভাবেই জানে। বার্সেলোর পথঘাটে, আমাজনের নদীর তীর ধরে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে শৈশব কেটেছে তার। সেই সময়ে অনাথ ম্যানুয়েলকে প্রতিদিনের খাবার প্রতিদিনই সংগ্রহ করতে হত। কখনও কটা পয়সার জন্য ভিক্ষার হাত বাড়াতে হত ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে, আবার কখনও হাত একেবারেই খালি হয়ে গেলে চুরি করত সে। ফলে একদিন তাকে রোমান ক্যাথলিক আওতাধীন সেলসিয়াল মিশনারিতে নিয়ে থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার সুযোগ করে দেয়া হয়। ম্যানুয়েল বেশ সফলতার সাথেই ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলো থেকে বায়োলজিতে একটা ডিগ্রি নেয়। তার স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দেয় ব্রাজিলিয়ান ইন্ডিয়ান ফাউন্ডেশন ফুনাই, আর এই স্কলারশিপের টাকা শোধ করতেই তাকে স্থানীয় ইন্ডিয়ানদের সাথে বিভিন্ন কাজ করতে হত । যেমন : ইন্ডিয়ানদের ঐতিহ্যগত আগ্রহের বিষয়-বস্তু, পুরনো জীবনধারা সংরক্ষণ করতে শেখানো, নিজেদের ভূ-খণ্ড বৈধভাবে নিজেদের দখলে রাখা, এসব। ত্রিশ বছর বয়সে সাও-গ্যাব্রিয়েলের স্থানীয় ফুনাই-এর অফিসের প্রধান করে পাঠানো হয় তাকে । ইয়ানোমামো অঞ্চলে বন্যপ্রাণীর চোরাকারবারিদের সম্পর্কে তদন্ত করতে গিয়ে তারই মত আরেক অনাথ টরটরকে খুঁজে পায় সে। আক্রমণকারী এক দস্যুর লাথি খেয়ে ওটার পেছনের ডান পা-টা থেতলে যায়। প্রচন্ড আঘাত পেয়ে কাতরাচ্ছিল ছোট্ট প্রাণীটি । ম্যানুয়েল এটা উপেক্ষা করতে পারে নি। ফুপিয়ে কাঁদতে থাকা বাচ্চাটাকে কম্বলে জড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসে সে। তারপর আজকের এই টরটরকে এতো বড় করার জন্য সব রকম যত্ন নিতে থাকে।

ম্যানুয়েল তার সামনে ধীরে ধীরে ছুটতে থাকা টর-টরের দিকে তাকাল । ছোটবেলার আঘাত পাওয়া পা-টা এখনও কিছুটা বাঁকা। ম্যানুয়েল ভাবল, আর মাত্র একবছরেরও কম সময়ের মধ্যে তার আদরের টর-টর পরিপূর্ণ যৌবনে পা দেবে। তখন ওটার মাঝে বন্যতা এবং হিংস্রতা এতটাই বেশি হবে যে ওটাকে জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। তবে তার আগে নিজেকে বাঁচানোর সব কলা-কৌশল জানতে হবে ওকে।

জঙ্গলে অনভিজ্ঞদের কোন জায়গা নেই।

সামনেই জঙ্গলের শেষ মাথা ঢালু হয়ে স্যারেড ওয়ের পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে মিশেছে । জরাজীর্ণ আর পাকাবাড়ির সংমিশ্রণে বেড়ে ওঠা সাও-গ্যাব্রিয়েল ম্যানুর সামনেই বিস্তৃত হয়ে আছে । নিগ্রো নদীর চর দখল করে বেড়ে ওঠা স্থাপনার মধ্যে কিছু বড়বড় হোটেল এবং ঘর-বাড়িও চোখে পড়ে যেগুলো গত অর্ধশতকের মধ্যে গড়ে উঠেছিল ক্রমবর্ধমান পর্যটকদের থাকার জায়গা সংকুলানের জন্য। অদূরেই একটি বাণিজ্যিক বিমানবন্দর আছে এখানে। ওটার রানওয়ে দেখে মনে হয় যেন সবুজের বুকে বিশাল একটা কালো দাগ এঁকে দিয়েছে কেউ। এতসব কর্মকান্ড দেখে স্পষ্টতই বোঝা যায়, এই দূরের বন-জঙ্গলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কখনই থামবে না ।

কপালের ঘাম মোছা শেষ হতেই ম্যানুয়েল ধাক্কা খেল টর-টরের সাথে। সে খেয়াল কল ওটা থমকে গিয়ে ঘরঘর শব্দ করছে। কোন বিপদ সংকেত।

“কি হয়েছে?”

তারপর সে নিজেও শুনতে পারল ওটা। সবুজের চাদরে ঢেকে থাকা পুরো জঙ্গলজুড়ে একটা শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, গভীর একটা স্পন্দন বাড়ছে ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছে তাদের চারপাশ থেকেই আসছে। সংকুচিত হলো ম্যানুর চোখ, চিনতে পারল শব্দটা কিসের, যদিও এই শব্দ খুব কমই শোনা যায় এখানে। একটা হেলিকপ্টার। সাও-গ্যাব্রিয়েলে ভ্রমণ করা বেশিরভাগ লোকই রিভার বোট বা ছোটপাখার প্লেনে করে আসে। এই জঙ্গলে আসতে যে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয় তা হেলিকপ্টার দিয়ে দেওয়া কঠিন। এমনকি স্থানীয় ব্রাজিলিয়ান আর্মিদের বেসক্যাম্পেও এই ডানাওয়ালা যন্ত্র মাত্র একটা আছে, তা দিয়েই উদ্ধার কাজ থেকে শুরু করে চোরাকারবারীদের ধরার কাজ চলে।

শব্দের পরিমান বাড়ছে খুব দ্রুত, আর তাতেই মনে একটু খটকা লাগল । সে ভাল করেই বুঝতে পারলো হেলিকপ্টারের সংখ্যা একাধিক । আকাশের দিকে তাকিয়ে খুঁজলেও কিছুই চোখে পড়ল না তার। হঠাৎ টর-টর আতঙ্কিত হয়ে পড়ল । কিছু একটা আঁচ করতে পেরে দৌড়ে পাশের ঝোপের আড়ালে গিয়ে লুকাল ওটা। তিনটি হেলিকপ্টারের একটি স্কোয়াড সশব্দ উড়ে গিয়ে চোখের পলকে মাউন্ট অফ স্যারেড ওয়ে অতিক্রম করে ছোট্ট শহরটার উপর চক্রাকারে ঘুরতে লাগল বোলতার ঝাঁকের মত। মলিটারিদের এই হেলিকপ্টারের সবগুলোই ইউএইচ-১ হিউজ মডেলের । ম্যানু মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাতেই চতুর্থ চপারটি তার ঠিক উপর দিয়ে হিসহিস শব্দ করতে করতে উড়ে গেল । প্রথম তিনটি থেকে এটি সম্পূর্ণ আলাদা ধাঁচের, চমৎকার গড়ন, রংটা চকচকে কালো। বিশেষ আকৃতির গঠন আর লেজের প্রান্তে থাকা পাখাগুলো দেখে এটাকে বেশ ভাল করেই চিনত্রে পরলো সে। মিলিটারিতে কিছুদিন কাজ করার সুবাদে এগুলো তার খুব পরিচিত।

আরএ-৬৬ কমানখ মডেলের এই চপারটি ব্যবহৃত হয় শত্রুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও আক্রমণের কাজে ।

হালকা পাতলা হেলিকপ্টারটি ম্যানুর এত কাছ দিয়ে উড়ে গেল যে ওটার একপাশে ইউএস-এর ছোট্ট পতাকাটা চিনতে পারলো ভালভাবেই । বাতাসের তীব্র ধাক্কায় প্রকম্পিত

হল গাছপালার উপরের অংশ। বানরেরদল আতঙ্কে চেঁচামেচি করতে করতে এদিকসেদিক ছোটাছুটি করতে লাগল, আতঙ্ক ছড়াল পাখিদের মাঝেও। লালডানার একঝাক টিয়াপাখি ছত্রভঙ্গ হয়ে উড়াল দিতেই নীল আকাশ যেন অগ্নি-স্ফুলিঙ্গে ছেয়ে গেল।

চতুর্থ হেলিকপ্টারটি ততক্ষণে ব্রাজিলিয়ান আর্মি বেসক্যাম্পের উপর ঘুরতে থাকা বাকি তিনটি হেলিকপ্টারের সাথে যোগ দিয়েছে। দ্রু কুঁচকে থাকা ম্যানু শিষ দিয়ে টরটরকে ডাকতেই ঝোপের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এল ওটা। চোখেমুখে এখনও কিছুটা ভয়। “ভয় পেও না, সব ঠিক আছে,” জাগুয়ারটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল সে।।

কয়েক মুহূর্ত পর হেলিকপ্টারগুলো মাঠে নামতেই পাখার ধপধপানি মিলিয়ে গেল । ম্যানু একটু এগিয়ে গিয়ে টর-টরের কাঁধে হাত রাখতেই ওটার ভেতরের ভয়ের পরিমাণ বুঝতে পারল, এই ভয় তাকেও বেশ গ্রাস করেছে। কোমরে গোঁজা চাবুকটা হ্যাচকা টান দিয়ে হাতে নিল সে। “শালার স্টেটস মিলিটারি! এই সাও-গ্যাব্রিয়েলে কি করতে এসেছে?” দম নিয়ে সামনের ঢালু রাস্তায় পা বাড়াল ম্যানুয়েল।

গভীর আমাজনের ঠিক মাঝে ইয়ানোমামোদর সেন্ট্রাল প্লাজা অবস্থিত। গ্রামের মাঝখানে প্লাজায় নাথান তার প্রতিপক্ষ বক্সারের সামনে নগ্ন অবস্থায় দাঁড়ালো। তার চারপাশে ইয়ানামামো শাবানো ও ছোটছোট গোলাকৃতি ঘর বেষ্টন করে আছে। একটা ফুটবল মাঠের অর্ধেক পরিমাণ জায়গার সমপরিমাণ জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই প্লাজার ছাদেও মাঝ বরাবর বেশ খানিকটা জায়গা খোলা যাতে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে। নারী এবং বৃদ্ধরা কলাপাতা ছাওয়া এক জায়গার দোলনার উপর আরাম করে বসেছে আর যুবকেরা ব্যস্ত অন্য কাজে। হুইয়াসদের সাথে তারা যোগ দিয়ে তীর-বর্শা তাক করে রেখেছে। নাথানের দিকে যেন পালানোর কোন চেষ্টাই সে করতে না পারে।

প্রথম দিকে অস্ত্রের মুখে নাথানকে যখন ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা হচ্ছিল তখন সে তাদেরকে সব রকমভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল আসলে কি ঘটেছেঅ্যানাকোন্ডার কামড়ে সৃষ্ট কজির দগদগে ক্ষত প্রমাণস্বরূপ দেখানোর পরও তার কথা কেউ কানে তোলে নি। এমনকি গ্রামের প্রধান, যে নাথানের হাত থেকে মেয়েটিকে তুলে নিয়েছিল, এমনভাবে তাকে অবজ্ঞা করল যেন সে বিরাট বড় একটি অপরাধ করেছে

নাথান বেশ ভালভাবেই জানত এই বিচার শেষ হওয়া পর্যন্ত তার কোন কথাই শোনা হবে না । ইয়ামোমামোরা এরকমই বিচার করে নাথান এই দ্বৈত-যুদ্ধ করার দাবি করেছে কিছুটা সময় পার করার জন্য। আর তাই যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ তার কথা শুনবে না। এখন শুধুমাত্র ঈশ্বর যদি তাকে জয়ের মুখ দেখান তবেই সে কিছু বলতে পারবে এই যুদ্ধবাজ ইয়ানামামোদের কাছে।

খালি পায়ে কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে নাথান । অপরপ্রান্তে একদল হুইয়াস বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত কে যুদ্ধে নামবে, কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হবে এসব নিয়ে। প্রথাসিদ্ধ দ্বৈতযুদ্ধে সাধারণত নাবরুশি, হালকা লাঠি, সূঁচালো মাথার আট ফুটের লম্বা লাঠি ব্যবহার করা হয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে ব্যবহার করা হয় বিশালাকৃতির ছুরি বা বর্শার মত প্রাণঘাতি অস্ত্র।

হঠাৎ থেমে গেল চিল্লাপাল্লা, সরে গেল মানুষের দল। একজন ইন্ডিয়ান সামনে এগিয়ে এল। স্থানীয় গোত্রের মানুষ হিসেবে যথেষ্ট লম্বা এই মানুষ প্রায় নাথানের মতই। পেশীবহুল এই পুরুষটির নাম তাকাহো, সে গোত্রপ্রধানের ভাই। তবে তার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো সে টামার বাবা। পরনে আর একটা কোমরবন্ধনী ছাড়া আর কিছুই নেই যেটার ঝুলে থাকা সামনের অংশ তার লিঙ্গের অগ্রভাগ পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে। সারা বুকজুড়ে উজ্জ্বল বর্ণে ও রেখায় সজ্জিত তাকাহো মাথায় বানরের লেজের হেডব্যান্ড পরে মুখে গাঢ় রং মেখে রণক্ষেত্রে হাজির হয়েছে। নিচের ঠোটে তামাকের পুরুস্তর তাকে পুরোপুরি এক যোদ্ধার রূপ দিয়েছে যেন। সে এক হাত বাড়িয়ে দিতেই একজন ইন্ডিয়ান পড়িমরি করে ছুটে এসে তার হাতে বড়সড় একটা কুড়াল ধরিয়ে দিল। কালচে লাল রঙের স্নেইক-উডের হাতলটা একটু বাঁকানো আর অগ্রভাগে স্টিলের সঁচালো একটি ক্যাপ লাগানো। যেকোন দ্বৈতযুদ্ধের ক্ষেত্রে এই ভয়ালদর্শন হাতিয়ারের পক্ষে নৃশংস দৃশ্যের অবতারণা করা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার । এরকম আরেকটি কুড়াল দেওয়া হল নাথানের হাতেও। তার অপরপ্রান্তে এক হুইয়াসকে দৌড়ে আসতে দেখল নাথান। ওর হাতে একরকম তৈলাক্ত তরল পদার্থের পাত্র। হুইয়াসটা তরলে রা পাত্র তুলে ধরতেই তাকাহো তার কুড়ালের মাথাটা তরলের মধ্যে চুবিয়ে নিল।

নাথান জলবৎ পদার্থটাকে চিনতে পারলো সহজেই। কিছুদিন আগে এক শামানকে এটা বানাতে শিখিয়েছিল সে। স্থানীয় ভাষায় এটাকে বলে উরারি আর ইংরেজরা বলে ‘কিউয়ারি। মুনসিড গোত্রের একধরনের বিশেষ লতানো আঙ্গুর গাছের আঙ্গুর থেকে বেরা এই বিষ এতটাই মারাত্মক যে মুহূর্তেই এটা যেকারো স্নায়ুকে অকেজো করে দিতে পারে। এই বিশেষ পয়জনটা বানানো হয়েছিল মূলত বানর শিকার করার জন্য কিন্তু আজকে এটা ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে আরো অশুভ একটি কাজে।

চারপাশে একটু দৃষ্টি বুলালো নাথান। তার জন্য কেউ কোন পাত্র আনল না যাতে সেও তার কুড়ালটার মাথা ভেঁজাতে পারে। গ্রামপ্রধান মাথার ধনুক তুলে ধরে বিশেষ এক ধরনের শব্দ করল যেন যুদ্ধটা এখনই শুরু হয়।

দক্ষতার সাথে হাতের কুড়ালটা ঘোরাতে ঘোরাতে প্লাজার প্রান্ত বরাবর হাটতে লাগল তাকাহো। নাথানও তার কুড়ালটা একটু উপরে তুললো। কিভাবে জিতবে সে এখানে? প্রতিপক্ষের অন্ত্রের সামান্য একটু খোঁচা খাওয়া মানে অবধারিত মৃত্যু। টামাকে বাঁচানোর জন্যই সে আজ এখানে কিন্তু তাকে বাঁচাতে দুঙিয়া মানে তার বাবার মৃত্যু হতে হবে নাথানের হাতে। নিজের ভারসাম্য ঠিক রাখতে হাতের কুড়ালটা বুক বরাবর সোজা তুলে ধরল নাথান । প্রতিপক্ষের ক্রোধান্বিত চোখ তাকে খেয়ে ফেলতে চাইছে যেন।

“আমি তোমার মেয়েকে আঘাত করি নি,” রাগ ও হিংস্রতা জড়ানো গলায় চিৎকার করে বলে উঠলো সে।

তাকাহোর চোখ দুটো সংকুচিত হয়ে গেল। নাথানের বক্তব্য তার কানে পৌঁছেছে ঠিকই কিন্তু অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে তার চোখে। মেয়ের কথা মনে উঠতেই সে অন্যদিকে দৃষ্টি দিল যেখানে গ্রামের শামান তার মেয়ে টামাকে সারিয়ে তোলার কাজে ব্যস্ত । ছিপছিপে লম্বা এই বৃদ্ধ শামান মেয়েটার উপর ঝুঁকে মন্ত্র আওড়াতে আওড়াতে শুকনো ঘাস, লতাপাতা পুড়িয়ে ধোয়ার একটি আস্তরণ তৈরি করে ফেলেছে তাদের চারপাশ ঘিরে। লতাপাতা ও লবণের মিশ্রণ এক ধরনের কটু গন্ধের সৃষ্টি করেছে যা নাথানের নাকেও ধরা পড়ল। অনেক প্রচেষ্টা চলছে কিন্তু মেয়েটা এখনও নিথর ।

নাথানের দিকে দৃষ্টি হানল তাকাহো। হুঙ্কার দিয়ে ইন্ডিয়ানটা ঝাপিয়ে পড়ল তার দিকে, হাতের কুড়ালটা চালালো একেবারে নাথানের মাথা বরাবর।

অল্পবয়সে কুস্তির প্রশিক্ষণ নেওয়া নাথান ভালভাবেই জানে একেবারে নিজেকে কিভাবে সরিয়ে নিতে হয়। সে খুব দ্রুত নিচু হতেই তাকাহেরি কুড়ালটা তার মাথার উপর দিয়ে চলে গেল, আর সেই সুযোগে নিজের অস্ত্রটা চালালো প্রতিপক্ষের পা লক্ষ্য করে । তীব্র এক ঝাকুনি খেয়ে তাকাহো পড়ে গেল কাদায়। মাথার ব্যান্ডটাও ঢিলে হয়ে গেল। নাথান কঠিন আঘাতের পরিবর্তে কুড়ালের ধারহীন প্রান্ত দিয়ে আঘাত করায় তাকাহোর কোথাও জখম হলো না। সে কাদার মধ্যে পড়তেই নাথান তার বিশাল দেহ নিয়ে ইন্ডিয়ানটার উপর ঝাপিয়ে পড়তে চাইলো। একবার যদি তাকে বোঝাতে পারতাম।

কিন্তু চিতার ক্ষিপ্রতায় একপাশে সরে গেল তাকাহো । আবারো তার কুড়ালের ঘা বসিয়ে দিল নাথানের দিকে। বিষাক্ত ব্রেডটা একেবারে নাকের সামনে দিয়ে সাই করে নাথানের দু-হাতের মাঝ দিয়ে কাদার মধ্যে আছড়ে পড়ল। “মরতে মরতে বেঁচে গেছি।”

আবারো নাথানের উপর আঘাত এলে এবার সে যথেষ্ট দেরি করে ফেলল। তাকাহোর আক্রমণকে ধোকা দিতে পারল না, ওর বন্যপায়ের সজোরে লাথি এসে লাগল নাথানের মাথায়। কাদায় মধ্যে ছিটকে পড়ল নাথান। তার মনে হতে লাগল যেন সে দু-কানে বাতাসের শন শন শব্দ শুনতে পাচ্ছে। আঘাতের চোটে তার পেশীবহুল হাতে ধরে থাকা কুড়াল ছিটকে পড়ল দর্শকদের মধ্যে । কেটে যাওয়া ঠোটের রক্ত মুছতে মুছতে নাথান উঠে দাঁড়াল খুব দ্রুত। তার প্রতিপক্ষও দাঁড়িয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

কাদার মধ্যে গেঁথে যাওয়া কুড়ালটা নেবার জন্য তাকাহো একটু নিচু হতেই নাথান ওর কাঁধের উপর দিয়ে শামানের দিকে খেয়াল করল । বৃদ্ধ লোকটা ধোঁয়ার কুন্ডলী সৃষ্টি করেছে টামার ঠোট ও মুখের চারপাশে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে খারাপ আত্মাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া এটি। শামানের চারপাশে আরও কিছু হুইয়াসও যোগ দিয়েছে তার সাথে মন্ত্র আওড়ানোর জন্য-যেন দুষ্ট আত্মার মৃতু খুব তাড়াতাড়ি হয়।

তাকাহো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গর্জন করতে করতে নাথানের দিকে ফিরল। মুখের লাল রঙ দেখে মনে হচ্ছে যেন ক্রোধের আগুন। মুহূর্ত পরেই হাতের কুড়ালটা ঘোরাতে ঘোরাতে নাথানের দিকে ধেয়ে আসতে লাগল সে।

এভাবেই মরছি তাহলে! একটু পেছনে সরে যেতে যেতে ভাবল নিরন্দ্র নাথান । আরও একটু পেছনে সরতেই ইন্ডিয়ানদের তা করে রাখা অন্ত্রের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তার।

পালানোর কোন রাস্তাই নেই। এদিকে তাকাহো এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। চূড়ান্ত আঘাতের জন্য অপেক্ষা…ধীরে ধীরে কুড়ালটা উঁচু করে ধরল ওর মাখা বরাবর। মৃত্যু থেকে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নাথান ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যতই বেঁকে যাচ্ছে পেছন দিকে তার নগ্ন পিঠে ইন্ডিয়ানদের বর্শার খোঁচা অনুভব করতে পারছে বেশ ভালভাবে। তাকাহো দু-হাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে কুড়ালটা ধরে নাথানের মাথা বরাবর কোপ বসাতে উদ্যত।

কুড়ালটা নামছে। স্পন্দন বাড়ছে নাথানের।

Next

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন