Below Post Ad

সাপের তেল

 ইউলো!” তীক্ষ চিৎকারটা ছড়িয়ে পড়ল মন্ত্র পড়তে থাকা হইয়াসদের শোরগোল ছাপিয়ে । “থামো?”

যে আঘাতের ভয়ে নাথান আড়ষ্ট হয়ে গেছিল সেই আঘাত আর তার উপর এসে পড়ল না। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলেও মুখ তুলে তাকাল সে। তাকাহোর কুড়ালটা তার মুখ থেকে মাত্র ইঞ্চিখানেক দূরে স্থির হয়ে আছে। এক ফোঁটা বিষ বেয়ে পড়ল ওটা থেকে নাথানের চিবুকে।




যে শামান চিৎকার করে উঠেছিল সে মানুষজন ঠেলেঠুলে একেবারে প্লাজার মাঝখানে চলে এল হাঁফাতে হাঁফাতে। “জ্ঞান ফিরেছে তোমার মেয়ের।” নাথানের দিকে নির্দেশ করল সে তারপর, “তোমার মেয়ে বলছে তাকে নাকি বড় একটা সাপের হাত থেকে এই সাদা লোকটা বাঁচিয়েছে।”

সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল এবার টামার দিকে, কিছু মহিলা গুয়াড় ফলের খোসা দিয়ে বানানো পানিরপাত্র ধরে রেখেছে টামার মুখের সামনে। সেই পাত্র থেকে দূর্বলভাবে আস্তে আস্তে চুমুক দিয়ে পানি পান করছে মেয়েটি। তাকাহো নাথানের দিকে তাকাতেই তাদের মধ্যে চোখাচোখি হল । মেয়েটির পিতার কঠিন অভিব্যক্তি ধুয়ে-মুছে গেল পরিত্রাণের স্রোতে। হাতের অস্ত্রটা কাদার মাঝে ছুঁড়ে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে। তারপর একটা খালি হাত নাখানের কাঁধের উপর রেখে সজোরে তাকে বুকে টেনে নিল।

“জ্যাকো”, নাথানকে খুব শক্ত করে ধরে বলল সে। “ভাই।” আর এভাবেই কঠিন এই পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটল। তাকাহের ভাই অর্থাৎ গোত্রপ্রধান সামনে এগিয়ে এল।

“তুমি লড়েছ সুসুরি অ্যানাকোন্ডার সাথে, ওটার খপ্পর থেকে আমাদের মেয়েকে বাঁচিয়েছ।” সে তার চুলে গোজা পালক থেকে একটা লম্বা পালক খুলে নাথানের চুলে গুঁজে দিল । এই পালক দূত ও হিংস্র জাতের এক ঈগলের। যে কারো জন্যই এটা-আরাধ্যের বিষয়। “তুমি আর কোন নেইব নও, বাইরের কেউ নও। তুমি এখন জুফোভাই, আমার ভাই, আমার ভায়ের ভাই, তুমি আজ থেকে একজন ইয়ানোমামো।” ।

বিরাট একটা আনন্দ ধ্বনিতে জেগে উঠলো সমগ্র শাবানো ।

নাথান জানে এই সম্মান যেকোন সম্মান থেকেও বড় কিন্তু তার মনে অন্য একটা শঙ্কা দানা বেঁধে ছিল অনেক আগে থেকেই। “আমার বোন, টামার দিকে দেখিয়ে বলল নাথান। ইনোমামোদের মধ্যে কারো নাম ধরে ডাকা একেবারেই নিষিদ্ধ, হোক সে পুরুষ বা নারী। টামা শোয়া অবস্থায় একটু কাতরে উঠলো। “আমার বোনের অসুস্থতা এখনও কাটে নি। ওকে সাও-গ্যাব্রিয়েলে নিয়ে গিয়ে ওখানকার ওষুধপত্র দিলে আমার মনে হয় ও সুস্থ হয়ে যেত।” বৃদ্ধ শামান এবার এগিয়ে এল এ-কথা শুনে। নাথান শামানের এগিয়ে আসা দেখে ভয় অনুভব করল । তার ভয় শামানটি হয়ত এমন কিছু বলবে যে তার চিকিৎসাই মেয়েটির অসুস্থতা দূর করার জন্য যথেষ্ট। স্বাভাবিকভাবেই শামানরা খুব উচ্চগোত্রীয় হওয়ায় তাদের কথা বা কাজের উপর অন্য কারোর হস্তক্ষেপ মোটেই ভালভাবে দেখা হয়

। কিন্তু বয়স্ক শামানটি সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে নাথানের ঘাড়ে হাত রাখায় ঘটনা ইতিবাচক দিকেই মোড় নিল ।

“আমাদের এই নতুন ভাইটি সুসুরির হাত থেকে আমাদের বোনকে বাঁচিয়েছে। ঈশ্বর তাকে আমাদের বোনের রক্ষাকারী হিসেবে পাঠিয়েছেন। আমাদের উচিত সেই ঈশ্বরের কথাই শোনা। তার চিকিৎসার জন্য আমি আমার সাধ্যমত করেছি, এরপর কিছু করা আমার ক্ষমতার বাইরে।” স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে নাথান তার মুখে লেগে থাকা পয়জন মুছতে লাগল সতর্কতার সাথে, যেন সেটা আবার তার ঠোটের ক্ষতস্থানে না লাগে। নাথান ভাবল এই বৃদ্ধ শামান যা করেছে তা আসলে যথেষ্ট থেকেও বেশি। তার প্রাকৃতিক চিকিৎসা মেয়েটার জীবন ফিরিয়ে এনেছে, হোক সেটা কিছু সময়ের জন্য । মোছা শেষ হতেই বৃদ্ধ শামানকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে তাকাহোর দিকে ফিরল সে। “তোমার ডিঙ্গি নৌকাটা পেলে ভালই হত, ভাই।” ‘আমার যা আছে সব তোমার,” বলল তাকাহো। “আমিও তোমার সাথে সাওগ্যাব্রিয়েলে যাবো।”

সায় দিল নাথান। “তাড়াতাড়ি করতে হবে আমাদের।”

অল্পসময়ের মধ্যেই বাঁশ ও পাম পাতায় বানানো স্ট্রেচারে টামাকে শুইয়ে স্ট্রেচারসহ নৌকাতে নিয়ে রাখা হল । তাকাহো চট করে পোশাক বদলে এল ত, এবার বড় আয়তনের হাতাকাটা ট্যাংক টপ আর হাটু পর্যন্ত নাইকি শর্টস। নৌকা সামনের অংশে নাথানকে যেতে বলে নৌকায় চড়ে বসল তাকাহো, তারপর সে বৈঠা দিয়ে পানিতে ধাক্কা দিতেই তাদের নৌকা নেগ্রো নদীর মূল স্রোতে এসে পড়ল। এই নদীই তাদেরকে সাওগ্যাব্রিয়েলে নিয়ে যাবে ।

দীর্ঘ দশ মাইল যাত্রায় নীরবই রইল তাদের সঙ্গী। টামা কখনো সজাগ, কখনো ঘোরের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। আবার মাঝেমাঝে মৃদু কাতরানোর শব্দ আসছে ওর কোমল ওষ্ঠ থেকে। নাথান একটা কম্বল জড়িয়ে দিল ছোট্ট মেয়েটার শরীরে।

পরিচিত রাস্তা দিয়েই নৌকা চালাচ্ছে তাকাহো। ভেঙে পড়া ডালপালা আর নুয়ে আসা “গাছের ভেতর দিয়ে দক্ষতার সাথে পানির সবচেয়ে দ্রুত প্রবাহগুলোর মধ্য দিয়ে। একটু তার দিকে নেমে তাদের নৌকা গতি পেতেই বর্শা দিয়ে মাছ ধরতে থাকা বেশ কিছু প্রতিবেশী ইয়ানামামোদের অতিক্রম করল তারা । নাথান দেখল এক ইয়ানোমামো মহিলা কালো রঙের একরকম পাউডার উপর থেকে পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। নাথান জানে সে কি করছে। আয়াইয়া নামক এক রকম আঙ্গুর শুকিয়ে গুড়ো করে তা নদীর বিশেষ এক জায়গায় ফেলা হয়। সাধারণত উচু জায়গায় যেখান থেকে পানির স্রোত কিছুটা নীচে নেমে আসে, পানির চাপে সেই পাউডার তলিয়ে যায়, আর তারপরই শুরু হয় আসল কাজ। পানিরতলে অবস্থান করা মাছগুলো এই পাউডারের প্রভাবে অনেকটা বোধহীন হয়ে পড়ে, তখন উপরে উঠে আসা ছাড়া কিছু করার থাকে না। উপরে অপেক্ষারত পুরুষ ইয়ানোমামোরা সাথে সাথেই সেগুলো যার যার অস্ত্র দিয়ে ঘায়েল করতে থাকে। সমগ্র আমাজনজুড়ে ব্যবহৃত মাছ ধরার এই রীতি অনেক প্রাচীন। কিন্তু কতদিন টিকে থাকবে এই রীতি, এই ঐতিহ্য? এক প্রজন্ম? দুই প্রজন্ম? তারপর একদিন চিরতরে হারিয়ে যাবে এই কৌশলগুলো। নিজের আসনে দৃঢ়ভাবে বসে এই আমাজনে নির্দিষ্ট কিছু গোত্রের কথা ভাবল নাথান। যাদেরকে কখনো বশে আনা যায় না। সভ্যতা পুরো জঙ্গলজুড়ে প্রভাব বিস্তার করবে এসব কম সভ্যমানুষদের সভ্য বানানোর জন্য, এর ফলাফল ভাল হোক বা খারাপ থোক তাতে কিছুই যায় আসে না।

তারা আরেকটু সামনে এগোতেই নাথানের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সামনের গাছপালার ঘন সারির দিকে। এখানকার গাছের শাখা-প্রশাখাগুলো এত বড় আর বিস্তৃত যে নদীর দুই প্রান্তকে সংযোগকারী প্রাকৃতিক ব্রিজ তৈরি হয়ে গেছে আপনাতেই । সভ্য জগতের ছোঁয়া না লাগলেও প্রকৃতি যে নিজ থেকেই অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে পারে তার ভাল নিদর্শন এগুলো । গুনগুন, তীক্ষ চিঙ্কার, কর্কশ ও ঘোঁতঘোঁত শব্দে বিধৌত নাথানের চারপাশ ও আমাজনের পুরো বর্ণিল জগৎ।।

নদীর একপাশে একদল ফল-খেকো বানর হই-হুল্লোড় করে এগছ-গাছ করতে লাগল। তার ঠিক নিচে কমলা রঙের লম্বা ঠোটের বেশ কিছু কাদা-খোঁচা পাখি মাছ ধরায় ব্যস্ত। ওদের থেকে একটু ওপরে ডাঙ্গার দিকে বেশ কিছু শূকোরমুখো আমাজনিয় কুমির যার যার বাসস্থানে বসে রোদ পোহাচ্ছে। তাদের খুব কাছেই, একটু ওপরে, বোলতা ও বড় বড় ডাস-মাছির ঝাঁক মেঘের মত ভেসে বেড়াচ্ছে তাদের ক্ষুদ্র দেহে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করতে করতে । এখানে এই আমাজনে সবকিছুই নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী চলে । সীমাহীন এই জঙ্গল এতই রহস্যে ভরা যে মনে হয় এই জঙ্গল বা রহস্যের সবকিছুই অভেদ্য। এই গ্রহে এই আমাজনই একমাত্র অঞ্চল যেটা এখনো পুরোপুরি আবিষ্কার করা হয় নি। এখনো অনেক জায়গা আছে যেখানে পড়ে নি মানুষের পায়ের ছাপ। আর এগুলোই সেই রহস্য, সেই বিস্ময় যার মোহে মোহিত হয়ে নাথানের বাবা-মা অঙ্কের জীবনটা কাটাতে চেয়েছিল এখানে, ফলে এই বিশাল বনের প্রেম-ভালোবাসায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে তাদেরই একমাত্র সন্তান।

নাথান দেখল তারা জঙ্গল অতিক্রম করে সভ্যজগতে পা রাখতে শুরু করেছে, চারদিকে সেই সভ্যতারই চিহ্ন ফুটে উঠছে ধীরে ধীরে। তারা বুঝতে পারল তাদের নৌকা সাও-গ্যাব্রিয়েলের একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। শহর যে কাছেই তা নদীর পাড়ে কাজ করতে থাকা কয়েকজন কৃষককে দেখেই বোঝা গেল। নাথানদের নৌকা নদীতীরে খেলায় মগ্ন একদল ছেলেপুলেকে অতিক্রম করতেই ওরা একে অন্যকে নৌকাটা দেখাতে লাগল । যেন রকে টযুগের মানুষ ডায়নোসোর দেখছে। মাত্র অতিক্রম করে আসা আমাজনের শব্দের ঘনত্ব কমতে থাকলেও নাথানের নৌকা প্রবেশ করছে নতুন এক জগতে, নতুন এক বিশ্বে যেখানে শব্দের কারখানা গড়ে উঠেছে সারিসারি । ডিজেলচালিত ট্রাক্টরের শব্দ আসছে কৃষি জমি থেকে, তাদের ছোট্ট নৌকার আশপাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে চলা নৌকা থেকে আসছে ইঞ্জিনের শব্দ। আবার দু-একটা খামার বাড়ি থেকে মেউিওর শব্দও ভেসে আসছে। কিছুক্ষণ পরেই তারা একটা মোড় নিতেই পেছনের জঙ্গল হঠাৎ করেই যেন উধাও হয়ে গেল। সাও-গ্যাব্রিয়েলের ছোট্ট এই শহরকে দেখে মনে হয় এটা যেন ক্যান্সার আক্রান্ত কোন কোষ যা এই জঙ্গলের পেটটাকে খেয়ে ফেলতে ফেলতে বড় হচ্ছে। নদীর আশেপাশে যে স্থাপনাগুলো আছে তার মধ্যে সরকারী কিছু দালানকোঠা আর বাকিরা সব জলে ভেজা রোদে পোড় খাওয়া, স্যাঁতস্যাঁতে কাঠের তৈরি। একটু দূরে, বেশ কিছু ঘরবাড়ি পাহাড়ের গা বেয়ে গড়ে উঠেছে পরজীবীর মত। নাথানের নৌকার খুব কাছেই জাহাজঘাট ও পণ্যবাহী বড় বড় বার্জ। সব জায়গাতেই পর্যটকরা গিজ গিজ করছে।

নৌকা ভেড়ানোর জন্য নদীর পাশে একটা খোলা জায়গা দেখিয়ে তাকাহোর দিকে ফিরলো নাথান। সে দেখলো ইন্ডিয়ানটি তীব্র ভয় নিয়ে চেয়ে আছে শহরের দিকে । ভীত তাকাহর বৈঠা কখন যে বুকের সাথে আটকে ধরেছে তা নিজেও জানে না বোধহয় ।

“দুনিয়াটা এসবে ভরে গেছে,” অস্ফুট স্বরে বললো সে।

নাথান আবার দৃষ্টি দিল শহরের দিকে। সর্বশেষ সে এখানে এসেছিল মাত্র দু-সপ্তাহ আগে কিন্তু এরমাঝেই যে পরিবর্তন, যে কর্মযজ্ঞ তা তাকেই অবাক করে দিচ্ছে। সে ভাবল, সেখানে এত যান্ত্রিকতা আর হই-হুল্লোড় দেখে সেই মানুষ কিভাবে স্বাভাবিক থাকে যে কোনদিনই আমাজনের কোল থেকেই বের হয় নি? নির্দিষ্ট একটি জায়গা দেখিয়ে নৌকা ভেড়াতে ইশারা কল সে।

“তোমার মত একজন বড় যোদ্ধাকে ভয় পাইয়ে দেয়ার মত কিছুই নেই এখানে, বুঝলে? এখন চল, মেয়েকে হাসপাতালে নিতে হবে দ্রুত।”

। সায় দিল তাকাহ, ভয়ের জগৎ থেকে ফিরে আসতে আসতে। তার চোখেমুখে আবার সেই পুরনো শঙ্কার ছায়া ভেসে উঠল স্ট্রেচারে শোয়ানো টামার নিথর দেহের দিকে তাকাতেই। নাথানের দেওয়া নির্দেশিত পথেই নৌকা পাড়ে ভেড়াচ্ছে সে কিন্তু তার দৃষ্টি ও চিন্তা ভাবনার বড় একটা অংশজুড়ে আছে তার আশেপাশের এই যান্ত্রিক জগৎ। নৌকা থামতেই দু-জনেই হাত লাগালো টামার স্ট্রেচারটা নৌকা থেকে নামানোর কাজে। নড়াচড়া লাগতেই টামা একটু কাতরে উঠল। চোখের পাতাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠতেই চোখের ভেতরের সাদা অংশ দেখা গেল সহজেই। এখানে আসার সময়টুকুর মধ্যে বেশ মলিন হয়ে গেছে সে।

“খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে আমাদের।”

দু-জনে ধরাধরি করে স্ট্রেচারটা নামিয়ে কাদাপানিযুক্ত পথে একটু সামনে এগোতেই হা-করে তাকিয়ে থাকা মানুষের দৃষ্টি ও আশেপাশের ঘরবাড়ি থেকে আসা পর্যটকদের ক্যামেরার লাইটের তীব্র আলোয় বাঁধা পড়তে হল তাদের। তাকাহোর পরনে যদিও সভ্য পোশাক তারপরও তার মাথার বানরের লেজের ব্যান্ড, কানে গোঁজা পালক আর মাথার বাটিছাট চুল এগুলো বেশ ভালভাবেই জানান দিচ্ছে লোকটি আমাজনিয় ইন্ডিয়ান গোত্রের একজন।

সৌভাগ্যবশত একতলা হাসপাতালটি তাদের খুব কাছেই কাদামাটির রাস্তার শেষ প্রান্তে। মূল প্রবেশপথের ঠিক ওপরে রেডক্রসের প্রতীক অংকিত পতাকাটাই একমাত্র চিহ্ন যা দেখে বোঝা যায়, এটা একটা হাসপাতাল। তবে নাথান এর আগেও এখানে এসেছে মানাউস থেকে আসা কর্তব্যরত এক ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে। খুব দ্রুত রাস্তা ছেড়ে প্রধান ফটক দিয়ে হাসপাতালের ভেতর ঢুকতেই অ্যামোনিয়া ও ব্লিচিং পাউডারের গন্ধে নাক জ্বলে উঠল ওদের কিন্তু ভেতরটা খুব চমৎকারভাবেই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। ঠাণ্ডা বাতাস মুখ ছুঁয়ে যেতেই নাথানের মনে হল যেন ভেঁজা টাওয়েলে মুখ রেখেছে সে। কয়েকজন নার্সকে অতিক্রম করে এক মহিলার সাথে দ্রুত কথা বলতে শুরু করে দিল নাথান। তার কাছ থেকে সব শুনে ছোট গড়ন ও ভাল স্বাস্থ্যের এই মহিলার ভ্রু কুঁচকে গেল। যতক্ষণ পর্যন্ত না নাথান বুঝতে পারলো সে ইয়ানোমামাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছে না ততক্ষণ পর্যন্ত মহিলার ভ্রু কুঁচকেই থাকলো । বোঝার সাথে সাথেই তার মুখের ভাষা পর্তুগিজ ভাষায় পরিবর্তিত হল। “এই মেয়েটাকে অ্যানাকোন্ডা আক্রমণ করেছিল, মনে হয় কিছু হাঁড়ও ভেঙে গেছে। কি আমার মনে হয় ও যে ভয় পেয়েছিল সেটাই বেশি মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।”

“এদিকে আসুন,” মহিলা তাদেরকে দুইপাল্লার একটা দরজার দিকে যেতে নির্দেশ দিল, তারপর সন্দেহা দৃষ্টি হানল তাকাহোর দিকে।

ইনি মেয়ের বাবা?”

সায় দিল নাথান।

“ডা: রড্রিগেজ ডাক্তারি এক সভার জন্য বাইরে আছেন, কিন্তু জরুরিভিত্তিতে আসার জন্য তাকে আমি কল করতে পারি।”

“ঠিক আছে, তাই করুন,” বলল নাথান । মনে হয় আমি সাহায্য করতে পারব,” অন্য একটা কণ্ঠ বলে উঠল পেছন থেকে । নাথান ঘুরে দাঁড়াল।

লালচে বাদামী লম্বা চুলের ছিপছিপে দীর্ঘকায় এক নারী বসে আছে ওয়েটিং-রুমের কাঠের চেয়ারে। রেডক্রসের দেয়া পাত্রের এক অপর আড়ালে সে বসে থাকায় তাকে কারোর চোখে পড়ে নি। আর এখন আশারবাণী শোনাতে শোনাতে হাজির হয়ে সবাইকে বেশ ভালভাবেই পড়ে ফেলল সে।

সে উঠে আসতে নাথান আরেকটু সোজা হয়ে দাঁড়াল। “আমি কেলি ওব্রেইন,” পরিস্কার পর্তুগিজ ভাষায় বলল সে, তবে নাথান তার কণ্ঠে

বোস্টনের টান ভালই ধরতে পারল। একটা লাঠি দুটো সাপ পেঁচিয়ে রেখেছে-কুড়ুসিয়াস “মক খুবই পরিচিত একটি সিম্বলসম্বলিত আইডিকার্ড বের করে নাস্থানের সামনে তুলে ধরল সে। “আমি একজন আমেরিকান ডাক্তার।

ডা: ওব্রেইন,” সে বলল এবার ইংরেজিতে। ‘আমি অবশ্যই আপনার সাহায্য পেতে চাই। মেয়েটাকে আক্রমণ করেছিল ।স্ট্রেচারে শোয়া টামার শরীর হঠাৎ বেঁকে উঠল যেন। পা দুটো একটু নড়াচড়া করে সারা শরীরে কাঁপন উঠে গেল তার। “ওর শরীর খিঁচুনি দিচ্ছে,” বলল মহিলা, “এখনি ওয়ার্ডে নিতে হবে ওকে।” খাটো মহিলাটা সামনে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে ধরে রাখল স্ট্রেচারটা ঢোকার জন্য।

তাকাহো ও নাথান ইমারজেন্সি ওয়ার্ডের ছোট ঘরটায় দিকে ছুটতেই কেলি ওব্রেইন খুব দ্রুত একপাশে সরে গিয়ে চারটা বেডের একটা দেখিয়ে দিল। তারপর এক ঝটকায় পাশ থেকে এক জোড়া সার্জিক্যাল গ্লোভস হাতে লাগাতে লাগাতে জোরে জোরে বলল নার্সকে, “দশ মিলিগ্রামের ইয়াজিপাম নিয়ে এসোদ্রুত।”

নার্স মাথা নেড়ে সায় দিয়েই ওষুধের ক্যাবিনেটের উপর ঝুঁকে পড়ল। মুহুর্ত পরেই হলুদ রঙের তরলে ভরা একটি সিরিঞ্জ ওব্রেইনের হাতে দিল সে। ওব্রেইন ইতিমধ্যে টামার হাতে টারকুই বেঁধে দিয়েছে ওর হাতের শিরা খুজে পাওয়ার জন্য।

“ওকে একটু ধরুন, নাথান ও তাকাহোকে যেন আদেশ দিল সে। শান্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগটি জেগে উঠতেই একজন ক্লিনারকে সাথে নিয়ে নাথানদের কাছে চলে এল এক নার্স।

“একটা আইভি ও এক ব্যাগ এলআরএস রেডি করুন,” টামার সরু বাহুর শিরা খুঁজতে খুঁজতে তীক্ষ কণ্ঠে বলে উঠল কেলি। তারপর খুব দক্ষতার সাথে সিরিঞ্জের সূচটা ঢুকিয়ে ওষুধটুকু প্রবেশ করিয়ে দিল মেয়েটির শরীরে।

“এটা ভ্যালিয়াম,” কাজ করতে করতে বলল সে। “এটা ওকে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য অচেতন করে রাখবে। আর সেই সুযোগে বুঝতে পারবো ওর মূল সমস্যাটা কোথায়।”

তার কথা সত্য হল সাথে সাথেই। টামার শরীরের কাঁপুনী শক্তি হয়ে এল। দাপাদাপি করা হাত-পাগুলো স্থির হয়ে গেল বিছানার সাথে, শুধুমাত্র চোখের পাতা ও ঠোট একটু একটু কাঁপছে। একটা পেনলাইটের আলো ফেলে দু-চোখের মণি পরীক্ষা করল কেলি । সহকারী নার্স এসে আইভি লাইন ও ক্যাথেটার নিয়ে কার্জ করতে থাকা নাথানকে ঠেলে সরিয়ে দিল । নার্সের কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাহর আতঙ্কগ্রস্থ চোখ দুটো খেতে পেল

নাথান।

“কি হয়েছিল ওর?” মেয়েটিকে পরীক্ষা করতে করতেই জিজ্ঞেস করল কেলি।

সব খুলে বলল নাথান। “জ্ঞান হারাচ্ছে আবার জ্ঞান ফিরে পাচ্ছে। এরকম করেই বেশির ভাগ সময় কেটেছে ওর। গ্রামের শামান কিছু সময়ের জন্য ওর চেতনা ফিরিয়ে এনেছিল।”

“ওর কয়েকটা হাড় ভেঙে গেছে, আবার কয়েক জায়গায় রক্তক্ষরণও হয়েছে কিন্তু ওর এই যে খিঁচুনি, অচৈতন্য এগুলোর জন্য তো কিছু করতে পারছি না। হাসপাতালে আসার আগে কি কোন খিচুনি উঠেছিল?”

“না।” “আগে এরকম কিছু হবার নজির আছে?”

নাখান তাকাহোর দিকে ফিরে ইয়ানোমামোদের ভাষায় প্রশ্নটি বুঝিয়ে দিল। সায় দিল তাকাহো । “আহ-দে-মে-নাহ গাক্তি।

ভুরু কুঁচকালো নাখান । “কি বললেন উনি? ” জিজ্ঞেস করল কেলি । “আহ-দে-মে-নাহ হলো ইলেকট্রিক ইল আর গান্তি হলো রোগ। “ইলেকট্রিক ইল রোগ?”

নাথান সায় দিল । “এমনটাই তো বলল সে। ইলেকট্রিক ইল কাউকে আক্রমণ করলে তো প্রায়ই খিচুনি ওঠার কথা কারণ এটা খুব দ্রুত প্রভাব ফেলে। কিন্তু টামা কয়েক ঘন্টার মধ্যে পানির ধারে কাছেও যায় নি। আমি জানি না…সম্ভবত এমনও হতে পারে ইলেকট্রিক ইল মাছের জন্যে নয়, এই রোগকে ইয়ানোমামারা এমনিতেই ইলেকট্রিক ইল রোগ বলে ডাকে।”

এর জন্য কি তাকে কোন চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে? মানে কোন ওষুধপত্র?”

প্রশ্নটা বুঝিয়ে দিয়ে তাকাহোর কাছ থেকে উত্তরটা বুঝে নিল নাথান। “গ্রামের শামান প্রতি সপ্তাহে একবার চিকিৎসা করত তাকে। একরকম আঙ্গুর গাছ শুকিয়ে তার ধোয়া ব্যবহৃত হত ওষুধ হিসেবে।”

খুব বিরক্তির সাথে নিঃশ্বাস ফেলল কেলি। “তাহলে বলা যায়, তাকে কোন সঠিক চিকিৎসা বা ওষুধ দেয়া হয় নি। তার এই রোগ পুরনো। আর পানিতে যে ধস্তাধস্তি হয়েছে তার প্রভাবই যদি এই বার বার ফিরে আসা খিচুনির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তবে সেক্ষেত্রে অবাক হওয়ার মত কিছুই থাকবে না। ওর বাবার চোখেমুখে যে ভয় দেখছি..আচ্ছা, আপনি ওর বাবাকে ওয়েটিংরুমে নিয়ে গিয়ে বসাচ্ছেন না কেন? আমি দেখছি উচ্চমাত্রার কোন ওষুধ দিয়ে খিচুনির কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা।”

টামার শান্ত শরীরটার দিকে তাকালো নাথান। “আপনার কি মনে হয় ওর খুিঁচুনি আবার হবে?”

নাথানের চোখের দিকে তাকালো কেলি। “ওর এটা এখনও হচ্ছে।” সামান্য বেঁকে যাওয়া টামার মুখের দিকে নির্দেশ করল সে মেয়েটা এখন এপিলেপটিকাস অর্থাৎ নিরবিচ্ছি ঘোরের মধ্যে আছে। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত এই ধরনের বেশির ভাগ রোগীই মুখ দিয়ে এরকম শব্দ করে, অচেতন থাকে আবার শরীর নড়াচড়া করে অসংলগ্নভাবে। একটু আগে যেমন তীব্র কাঁপুনি এসেছিল ওর শরীরে এমনটা আবারো হতে পারে, আর এটা যদি আমরা না থামাতে পারি সে মারা যাবে।”

নাথান মেয়েটার দিকে তাকালো চোখ বড় বড় করে। “আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, পুরো সময় জুড়েই মেয়েটা এমন ঘোরের মধ্যেই ছিল?”

আপনার বর্ণনা হিসেবে কম হোক বা বেশি হোক ছিল।” “কিন্তু গ্রামের শামান তো কিছু সময়ের জন্য ওর জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছিল?”

“এটা আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।” কেলি মেয়েটার দিকে আবারো তাকাল । “ওর ঘোর কাটতে পারে এমন শক্তিশালী ওষুধ শামান ওকে দেয় নি।”

নাথানের মনে পড়ল ওর পানি খাওয়ার কথা। কিন্তু সে তো তাকে চিকিৎসা দিয়েছিল। শামানরা জাদুজানা ডাক্তার ছাড়া আর কিছু নয় এটা ভাবা ভুল। তাদের সাথে আমি দীর্ঘদিন কাজ করেছি, আমি তাদের কাজের ধরন সম্পর্কে জানি। তারা যথেষ্ট অভিজ্ঞ।” ।

“আচ্ছা…ঠিক আছে…ভাল হোক বা না হোক আমাদের কাছে আরও শক্তিশালী ওষুধ আছে যা খুব কার্যকারী।” সে টামার বাবাকে দেখিয়ে বলল, “আপনি ওনাকে ওয়েটিং-রুমে নিয়ে কেন বসাচ্ছেন না?” কেলি সহকারী নার্সটার দিকে ঘুরে দাঁড়াল নাথানকে পুরোপুরি অবজ্ঞা করেই।

নাথানের অভিব্যক্তিতে বেশ বিরক্তি ঝরে পড়লেও সে কেলির কথা শুনল। প্রায় একশ বছর ধরে পশ্চিমা ডাক্তাররা শামানদের তীব্রভাবে অবজ্ঞা করে আসছে। নাথান তাকাহোকে ওয়ার্ড থেকে বাইরে এনে ওয়েটিং রুমে বসিয়ে পা বাড়াল মূল দরজার দিকে। দ্রুত পা চালিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আমাজনের গরম বাতাসে ঝাপিয়ে পড়ল সে। আমেরিকান ডাক্তারটা বিশ্বাস করুক বা না করুক সে নিজে শামানকে দেখেছে টামার জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে। টামার এই রহস্যময় অসুস্থতাকে ব্যাখ্যা করার মত একজনই আছে এখানে, আর নাথান জানে কোথায় পাওয়া যাবে তাকে। গরম বাতাসের ভেতর দিয়ে শহরের দক্ষিণ দিকটাতে মাঝারি গতির দৌড় দিতেই দশ ব্লক দূরের ব্রাজিলিয়ান আর্মি ক্যাম্পের কাছে চলে এল সে। সাধারণত ঘুমিয়ে থাকা ক্যাম্পটি এখন সরগরম হয়ে উঠেছে। নাথান দেখল ইউনাইটেড স্টেটসের চারটি হেলিকপ্টার মাঠে,পার্ক করা। স্থানীয়রা ভিড় করে ক্যাম্পটার বেড়া ঘেঁষে এই ডানাওয়ালা যন্ত্রগুলো দেখছে। তাদের চোখেমুখে যে উত্তেজনা তা দেখে মনে হচ্ছে হেলিকপ্টারগুলো যেন স্বর্গ থেকে উড়ে এসেছে। নাথান এসব উদ্ভট ব্যাপার মাথা থেকে সরিয়ে দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দিল । তার লক্ষ্য এখন সামনের ব্লকটি যেখানে জরাজীর্ণ কাঠের একাধিক ঘর-বাড়ির মধ্যে কিছু কংক্রিটের পাকাবাড়ি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। খানিক দূরে থাকতেই নাথান তার গন্তব্যের নিশানা দেখতে পেল। এফ.ইউ.এন.এ.আই (FUNAI)-এই অক্ষরগুলো একটা বিল্ডিঙের বাইরের দেয়ালে বড় করে লেখা যা সহজেই চোখে পড়ল তার । বানইওয়া, ইয়ামোমামো ও স্থানীয় বিভিন্ন গোত্রের জনগনের মাঝে চিকিৎসা, শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার বিষয়ক কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে ব্রাজিলিয়ান ইন্ডিয়ান ফাউন্ডেশন-এর এই স্থানীয় অফিস। ছোট এই বিল্ডিঙের এক অংশে চলে অফিশিয়াল কাজ আর অন্য অংশে জায়গা করে দেয় সেই সব চালচুলোহীন ইন্ডিয়ানদের যারা সাদা চামড়ার লোকদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য নিজেদের ঘাম ঝরিয়ে যাচ্ছে।

এফ.ইউ.এন.এ.আই-এর এই অফিসে এর নিজস্ব মেডিকেল কাউন্সেলরও রয়েছে যে নাখানের পরিবারের খুব পুরনো বন্ধু এবং ওর বাবাকেও এই আমাজনসহ অনেক বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে খুব সুন্দরভাবেই । দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে একটা হলরুম পার হয়ে উপরে ওঠার সিঁড়িতে পা রাখল সে। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে প্রার্থনা করল তার বন্ধু যেন অফিসেই থাকে। দ্রুত পা ফেলে উপরে উঠে একটা খোলা দরজার কাছাকাছি আসতেই মোজার্টের বেহালার পঞ্চম কনাসার্টোর সুমধুর সুর কানে এল তার। থ্যাংক গড।

দরজার ফ্রেমে টোকা দিয়ে জোর গলায় ডেকে উঠল নাখন, “প্রফেসর কাউয়ি?”

ছোট্ট ডেস্কের ওপাশ থেকে কফিবর্ণের এক ইন্ডিয়ান মুখ তুলে তাকালো স্তুপ করে রাখা ফাইলের ওপর দিয়ে। মধ্য-পঞ্চাশে থাকা লোকটার কালো চুলগুলো কপালের দু-পাশ দিয়ে নেমে ঘাড়ের উপর পড়েছে। ধাতব ফ্রেমের চশমার পেছনে চোখ দুটো আটকে ছিল বইয়ের ওপর, নাখালকে চিনতেই চশমা জোড়া খুলে প্রাণখোলা হাসি দিল সে। ‘নাথান!” কাউয়ি উঠে ডেস্ক থেকে ছুটে এসে নাথানকে বুকে জড়িয়ে ধরল। এত জোরে ধরল যে ঘণ্টা কয়েক আগে যুদ্ধ করে আসা অ্যানাকোন্ডার কথা মনে পড়ে গেল তার। ওর বিশাল দৈহিক কাঠামোর জন্য শরীরে যেন ষা৺ড়ের মত শক্তি। পেশীবহুল লোকটা আগে দক্ষিণ ভেনিজুয়েলার টিরিওস গোত্রের শামান ছিল। প্রায় ত্রিশ বছর আগে নাথানের বাবার সাথে পরিচয় এবং খুব তাড়াতাড়িই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ওদের মধ্যে। কাউয়ি তার বাবার সহায়তায় খুব দ্রুত জঙ্গল ছেড়ে অক্সফোর্ডে চলে গেছিল পড়াশোনা শেষ করার জন্য। কয়েক বছর পর ফিরে আসে ভাষা এবং আদিম মানুষের ফসিলের উপর দুটো ডিগ্রি নিয়ে। এসব বিষয় ছাড়াও সে এ অঞ্চলের সেরা উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের একজন।

“বাবা, আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না তুমি এখানে। ম্যানুয়েলের সাথে দেখা হয়েছে তোমার?”

নাথান ভ্রু কুঁচকে দানবের মত মানুষটার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। “না তো! আপনি কি বলতে চাচ্ছেন?”

“মানে সে তোমায় খুঁজছে। এই তো ঘন্টাখানেক আগে সে এখানে এসেছিল তুমি এখন কোন অঞ্চলে গবেষণা করছ সেটা আমি জানি কিনা তা জানতে”

“কেন?”ভ্রু দুটো আরও কুঁচকে গেল নাথানের।

“কিছু বলে নি তবে তার সাথে টেলাক্স-এর একজন কর্পোরেট লিডার ছিল।”

চোখ দুটো একটু ঘুরে উঠলো নাথানের, টেলাক্স ফার্মাসিউটিক্যালস নামের এই বহুজাতিক কোম্পানিটি নাথানকে অর্থের জোগাদিচ্ছে বিভিন্ন গোত্রের শামানদের উপর তার গবেষণা চালানোর জন্য। নাথানের ভেতরের তিক্ত অনুভুতি বুঝতে পারল কাউয়ি।

“তুমিই সেই লোক বুঝলে, যে কিনা ওরকম খারাপ লোকদের সাথে চুক্তি করতে পার।”

“বাবা মারা যাওয়ার পর এটা করা ছাড়া আর কীইবা করতে পারতাম।”

কপাল কুচকালো কাউয়ি, “এত তাড়াতাড়ি তোমার সব সিদ্ধান্ত তোমার নিজের ওপর ছেড়ে দেওয়া কখনোই উচিত হয় নি। সব সময়ই তুমি ছিলে…”

“শুনুন,” তাকে থামিয়ে দিল নাথান। অনেক পেছনে ফেলে আসা জীবনের কালো অধ্যায়গুলো স্মরণ করতে চায় না সে। তার জীবনশয্যা সে নিজেই বানিয়েছে আর তাতে পিঠ ঘেঁয়াতে হবে নিজেকেই।

“টেলাক্স থেকেও বড় সমস্যা এখন আমার রয়েছে”, সে দ্রুত টামার সবকিছু ব্যাখ্যা করল। “আমি তার চিকিৎসা নিয়ে খুব চিন্তার মধ্যে আছি। ভাবছিলাম ডাক্তার যদি কোনভাবে সাহায্য করতে পারতেন।

কাউয়ি খুব দ্রুত তার পাশের শেলফ থেকে ফিশিং বক্সটা হাত বাড়িয়ে নিল।“বোকা, বোকা, সব বোকার দল।” একথা বলেই দরজার দিকে পা বাড়াল সে।

নাথান অনুসরণ করতে থাকল তাকে। প্রথমে সিঁড়িতে তারপর রাস্তা পর্যন্ত। লোকটা খুব দ্রুত হাটছে, তাই সারাপথ নাথানকেও জোরে জোরে হেটে তাল মেলাতে হল। কিছুক্ষণ পরেই হাসপাতালের মূল দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ওরা। নাথানকে ফিরে আসতে দেখে উঠে দাঁড়াল তাকাহো। “জ্যাকো…ভাই,” কাউয়িকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেল নাথান। “আমি একজনকে নিয়ে এসেছি, আমার মনে হয় তোমার মেয়েকে সারিয়ে তুলতে পারবে সে।”

পরিচয় পর্বের জন্য বিন্দুমাত্র অপেক্ষা কল না কাউয়ি। সে ইতিমধ্যে জরুরি, বিভাগের দরজার কাছে চলে গিয়েছে। নাথানও পিছু নিল দ্রুত । ওয়ার্ডে ঢুকেই সে যা দেখল তা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। চিকন আমেরিকানটা ঘেমেঘুমে একাকার হয়ে ঝুঁকে আছে কাঁপতে থাকা টামার উপর । আর নার্সরা স্বল্প জায়গায় ছোটাছুটি করে তার আদেশ পালনে ব্যস্ত । বিক্ষিপ্তভাবে কাঁপতে থাকা টামার শরীরের দিকে দৃষ্টি দিল কেলি। “মনে হয় আমরা তাকে বাঁচাতে পারবো না, ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলল সে।

“মনে হয় আমি সাহায্য করতে পারি,” বললো কাউয়ি, “ওকে কি ওষুধ দেয়া হয়েছে?”

কেলি ঘামে ভেজা কপালের ওপর থেকে চুলগুলো সরাতে সরাতে দ্রুত একটা লিস্ট ধরিয়ে দিল তার হাতে। সায় দিল কাউয়ি, তার ফিশিং বক্সের ভেতর হাত চালিয়ে অনেক ছোটখাট জিনিসের মধ্য থেকে একটা ছোট পাউচ বের করে আনল। “একটা নল লাগবে আমার।”

একজন নার্স খুব দ্রুত কাজ শুরু করে দিল ঠিক যেমনটি করছিল ডা. কেলির বেলায়। নাথান খেয়াল করল প্রফেসর কাউয়ির এটাই প্রথম আসা নয় এই হাসপাতালে । এই প্রফেসরের মত স্থানীয়দের মধ্যে হওয়া রোগ ও তার প্রতিকারবিষয়ক জ্ঞান আর কারো নেই।

“আপনি করছেন কী?” জিজ্ঞেস করল কেলি, তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। লালচে বাদামী চুলগুলো মাথার পেছনে বেঁধে দিল সে।

“ভুল ধারনার উপর কাজ করে যাচ্ছ তুমি,” শান্তভাবে বললো সে নলের ভেতর পাউডার ঢালতে ঢালতে।

ইলেকট্রিক ইল রোগের কারণে ওর শরীরে যে অসংলগ্ন নড়াচড়া বা খিচুনী হচ্ছে সেটা হয়তো সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের ডিজঅর্ডারের লক্ষণ হিসেবে ধরে নিয়েছ। কিন্তু এটা ওরকম স্নায়ুরোগ বা মৃগীরোগের মত কিছু নয়। মস্তিষ্ক থেকে মেরুদন্ডের মধ্যে দিয়ে যে ফ্লুইড প্রবাহিত হয় সেটার আভ্যন্তরীন অসামঞ্জস্যতাই এই রোগের মূল কারণ। ব্যাপারটা বংশানুক্রমিক, একই সাথে ইয়ানোমামোদের মধ্যে বিরলও।”

“হিরাভিটারি মেটাবোলিক ডিজঅর্ডার?”

“ঠিক তাই। এটা ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কিছু মানুষের ফেভিজম-এ আক্রান্ত হওয়া বা ভেনেজুয়েলার মারুন গোত্রের কিছু মানুষের কোল্ড-ফ্যাট-ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার মত।”

কাউয়ি মেয়েটিকে অতিক্রম করে নাথানকে হাত দিয়ে ইশারা করল।“শক্ত করে ধরে রাখো ওকে।”

নাথান এগিয়ে গিয়ে টামার মাথাটা বালিশের সাথে চেপে ধরল । শামান তার হাতের নলের একপ্রান্ত টামার নাকের ছিদ্রের মধ্যে খানিকটা ঢুকিয়ে দিয়ে অপরপ্রান্তে পাউডারের মিশ্রণ ঢালতে লাগল ধীরে ধীরে। ডা: ওব্রেইন পিছন থেকে সরে পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

“আপনি এই হাসপাতালের ডাক্তার? ডা: রড্রিগেজ?”

“নো, মাই ডিয়ার,” সোজা হয়ে বললো কাউয়ি, “আমি স্থানীয় তান্ত্রিক চিকিৎসক, মানে উইচ-ডক্টর।”

তীব্র ভয় আর অবিশ্বাসের অভিব্যক্তি নিয়ে তাকালো ডা: কেলি। সে বাঁধা দেওয়ার মত কিছু বলার আগেই টামার দাপাদাপি একটু থামতে শুরু করল। প্রথমে ধীরে তারপর দ্রুত।

কাউয়ি টামার চোখ পরীক্ষা করল। চামড়ার ফ্যাকাশে ভাবও কেটে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়িই। “কিছু ড্রাগস আমি পেয়েছি যেগুলো সাইনাসের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করালে সাইনাসের ঝিল্লি খুব দ্রুত ওটা শুষে নেয়। এটা শিরায় ওষুধ প্রবেশ কার মতই কার্যকরী।” বিস্ময়াভূত কেলি তাকিয়ে রইল টামার দিকে।

“এটা কাজ করছে”।

কাউয়ি তার হাতের পাউচটা এক নার্সের হাতে তুলে দিল। রড্রিগেজ কি রওনা হয়েছেন?”

“এই তো কিছুক্ষণ আগেই তাকে কল করেছি, প্রফেসর,” এক নার্স উত্তর দিল হাতের রিস্টওয়াচে চোখ বুলিয়ে, “দশ মিনিটের মধ্যেউনার এখানে চলে আসার কথা।”

“নিয়ম করে এই স্ট্র-এর অর্ধেক পরিমাণ পাউডার তিন ঘণ্টা পর পর ওকে দেবে। এরকম দেবে আগামী চব্বিশ ঘণ্টা। পরের দিন থেকে দিনে একবার দিলেই যথেষ্ট। এটা ওকে আরও আরও সুস্থিতভাবে টিকিয়ে রাখতে পারবে। তখন ওর অন্যান্য সমস্যাগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে ভালভাবে।”

“ঠিক আছে, প্রফেসর।”

এদিকে বিছানায় টামা চোখের পাতা পিট-পিট করতে করতে চোখ মেললো ধীরে ধীরে। চারপাশের অচেনা মুখগুলো দেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল সে। ভয়, অনিশ্চয়তা সবকিছু ফুটে উঠেছে তার মুখে। চোখ ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে একসময় তার চোখ স্থির হলো নাথানের উপর ।

“জ্যাকো বাশ্যে,” দূর্বল গলায় বললো সে।

“এই যে, আমি তোমার বানর ভাই, এখানেই আছি,” ইয়ানোমামোতে বললো সে টামার হাতে কোমলভাবে হাত বুলিয়ে । “তুমি এখন নিরাপদ। তোমার বাবাও আছে এখানে।”

এক নার্স তাকাহোকে নিয়ে এল। যখন সে দেখল তার মেয়ের জ্ঞান ফিরেছে, কথা বলছে, তখনই হাটু গেঁড়ে বসে পড়ল মেঝেতে। তার উদ্বিগ্নতা উবে গেল মুহূর্তে, আনন্দ অশ্রু সিক্ত করল তাকে।

“ও এখান থেকে ভাল হয়ে উঠবে, তাকাহোকে আশ্বস্ত করল নাথান।

কাউয়ি তার ফিশিং বক্স গোছগাছ করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। নাথান এবং ওব্রেইন পিছু নিল তার ।

“ঐ পাউডারে কি ছিল?” লালচে বাদামি চুলের ডাক্তার জিজ্ঞেস করল । “শুকনো কু-নাহ-নে-মাহ লতা।

নাথান বুঝিয়ে দিলো ডাক্তারের এই হতবুদ্ধির উত্তর । “এক ধরনের লতানো গাছ। এই একই গাছ গ্রামের শামানও ওকে দিয়েছিল, একটু আগেই আপনাকে যেমনটা বলেছিলাম।”

কেলি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। আমার মনে হয় আপনার কাছে আমার একটু ক্ষমা চাইবার আছে। আমি ভাবতেই পারি নি…মানে আসলে আমি কল্পনাও করতে পারি নি যে,”।

“পশ্চিমা চিন্তাধারা দিয়ে সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করার মত ধৃষ্টতা দেখানো একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার এখানে। এতে লজ্জিত হবার কিছু নেই।” কেলির কনুইতে আলতো করে হাত রেখে কথাগুলো বলে চোখ টিপলো কাউয়ি।

নাথানও স্থির থাকতে পারলো না। এরপর থেকে সবকিছু আরও ভাল করে শোনার চেষ্টা করবেন, কর্কশভাবে বলল সে।

মেয়েটা নীচের ঠোট কামড়ে ঘুরে চলে গেল।

এমন রূঢ় একটা আচরণ করে নাথানের নিজেকে খুব ছোট মনে হতে লাগল। সারাটা দিন ধরে চলতে থাকা দুশ্চিন্তা আর ভয় তার ধৈর্যকে নাজুক করে দিয়েছে । এই মেয়ে ডাক্তার তো তার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল আর সেটা জানার পরও তার সাথে নাথানের এমন রুক্ষ্ম আচরণ করা উচিত হয় নি মোটেই। সে দুঃখ প্রকাশ করার জন্য মুখ খুললো কিন্তু কিছু বলার আগেই সামনের দরজাটা শপাং করে খুলে গেল। লাল মাথার খাকি পোশাক পরা লম্বা এক মানুষ উপস্থিত হল সেখানে। মাথার উপর লাল রঙের সক্স বেসবল ক্যাপটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের বড় হয়ে গেছে । লোকটা লবি ধরে হেটে এসেই কেলির দিকে ইঙ্গিত করল ।

“কেলি, যদি এখানে তোমার সাপ্লায়ের কাজ শেষ হয়ে থাকে তো আমাদের এখান থেকে বেরুতে হবে। ওদিকে আমাদের জন্য নদীতে বোট অপেক্ষা করছে।”

“হ্যাঁ,” কেলি বলল। “আমার এখানকার কাজ শেষ। তারপর সে মাথান ও কাউয়ির দিকে ফিরলো, ধন্যবাদ আপনাদের।”

নাখানের চোখে কিছু সাদৃশ্য ধরা পড়লো এই তরুণ ডাক্তার এবং আগন্তুকের মাঝে। মুখের ছোপ ছোপ তিল, চোখের চারপাশের ভাঁজ এমনকি দু-জনের কণ্ঠেই বোস্টনের টান। মেয়েটার ভাই সে, ভাবলো নাথান । তাদের পেছন পেছন বের হয়ে রাস্তায় নামলো সে কিন্তু এগোতে পারলো না। ছোটখাট একটা ভীড় তাদের দিকে আসতেই প্রফেসার কাউয়িকে ঠেলেঠুলে পেছনে সরে আসতে বাধ্য হল নাথান ।

বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত দশজন সৈন্যের একটি দল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল। নাথান দেখলো অগ্রভাগ স্পেশাল এম-১৬ মডেলের অস্ত্র তাদের হাতে, কোমরে পিস্তল ঝোলানো আর পিঠে জিনিসপত্র বোঝাই ভারি ব্যাগ । সবার কাঁধে লাগানো নির্দিষ্ট ব্যাজটাও চিনতে পারলো। আর্মি রেঞ্জার্স, কমান্ডো সেনা। একজন রেডিওতে কথা বলে সৈন্যদলটিকে নদীর দিকে যেতে নির্দেশ দিল । কেলি ও আগন্তক যোগ দিল সেই দলের সাথে।

“হল্ট, দূর থেকে একজন মানুষ বলে উঠলো।

মিলিটারিদের দেয়াল সরে যেতেই পরিচিত একটি মুখ দেখা গেল। এটা ম্যানুয়েল অ্যাজভেদো। কালোচুলের খাটোমতো লোকটি সৈন্যদের ঠেলে সামনে এগিয়ে এলো। তার পরনে ছেড়া ট্রাউজার আর যে শার্ট গায়ে দেওয়া সেটার পকেট ছিড়ে ঝুলে আছে। কোমরে ঝুলছে সবসময়ের সঙ্গি চাবুক।

নাথানও ম্যানুয়েলের হাসি দেখে হাসতে হাসতে এগিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো। একে অপরের পিঠ কিছুক্ষণ চাপড়িয়ে ম্যানুয়েলের শার্টের ছেড়া অংশে হাত বুলাতে থাকলো সে। “টর-টরের সাথে আবারও খেলেছ দেখতে পাচ্ছি।”

দাঁত বের করে হাসল ম্যানুয়েল। “তুমি শেষবার দেখার পর দৈত্যটার ওজন আরও দশ কেজি বেড়েছে।”

হাসলো নাথানও। “দারুণ।

নাথানের চোখ গেল রেঞ্জার্স বাহিনীর দিকে, বেচারারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তাদের দুজনের দিকে। কেলি-ওব্রেইন এবং তার ভায়েরও একই অবস্থা । নাথান মিলিটারিদের উদ্দেশ্যে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে তাদের রাস্তা ছেড়ে একপাশে সরে দাঁড়ালো। “তো এসবের মানে কি? এরা কোথায় যাচ্ছে?”

মিলিটারি দলটার দিকে তাকাল ম্যানুয়েল দর্শকের কমতি নেই আশেপাশে। হাঁ করে তাকিয়ে আছে ছত্রভঙ্গ আর্মি রেঞ্জারসের দিকে । “দেখে মনে হচ্ছে ইউএস সরকার গভীর জঙ্গলে কোন গবেষণা বা অনুসন্ধানমূলক কাজে টাকা ঢালছে।”

“কেন? মাদক চোরাচালানিদের পিছু নিচ্ছে নাকি?” তখনি কেলি ওব্রেইন উল্টো হাটা শুরু করলো নাথানদের লক্ষ্য করে ।

কেলিকে দেখে ম্যানুয়েল মাথা নেড়ে সায় দিয়ে একটা হাত নাথানের দিকে বুড়িয়ে দিলো। “আমি কি আপনাকে ডা: রান্ডের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি? ডা: নাথান রান্ড।”

“মনে হচ্ছে আগেই আমাদের পরিচয় হয়েছে,” কেলি বললো একটু অস্বস্তিকর হাসি দিয়ে। কিন্তু সে তার নাম বলে নি আমাকে।”

নাথান অনুভব করলো কিছু নিঃশব্দ অভিব্যক্তি কেলি ও ম্যানুয়েলের মধ্যে আদানপ্রদান হলো। “কি হচ্ছে এখানে?” জিজ্ঞেস করলো নাথান, “নদী বেয়ে কী খুঁজতে যাচ্ছেন আপনারা?”

মেয়েটা সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালো ।এমেরান্ড পাথরের মত চকচকে সবুজ বর্ণের চোখ দুটো দারুণ আকর্ষনীয়। “আমরা আপনাকেই খুঁজতে এসেছি, ড. রান্ড।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন