Below Post Ad

পোস্টগুলি

সাপের তেল

সাপের তেল

অধ্যায় ১



অ্যানাকোন্ডা নামের বৃহৎ অজগরটি এক ইন্ডিয়ান মেয়েকে দৃঢ়ভাবে পেঁচিয়ে ধরে নদীর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। খুব সকালবেলা ঔষুধি গাছ সংগ্রহ করতে আসা নাথান র্্যান্ড ইয়ানোমামোর নিজ গ্রামে ফেরার সময় মেয়েটির চিৎকার শুনল । ঔষুধি গাছ ব্যাকটন ফেলেই সে দৌড়ে গেল মেয়েটিকে সাহায্য করতে। দৌড় শুরু করতেই সে তার কাঁধে ঝোলানো শর্ট ব্যারেলের শটগানটা হাতে নিয়ে উঁচু করে ধরলো । জঙ্গলে একা থাকাকালীন সময়ে সবাই অস্ত্র বহন করে। ঘন ঝোপঝাড় ভেঙে এগোতেই নাথান সাপ আর মেয়েটিকে দেখতে পেল। তার দেখা সবচেয়ে বড় এ্যানাকোন্ডার মধ্যে এটা একটা । প্রায় চল্লিশ ফুট লম্বা সাপটির অর্ধেক পানিতে, বাকি অর্ধেকটা নদীপাড়ের কাদার মধ্যে। শরীরের কালো আশটেগুলো ভিজে চকচক করছে। মেয়েটি যখন পানি নিতে নদীতে আসে, নিশ্চিতভাবে সাপটা সে-সময়ে ওৎ পেতে ছিল। দৈত্যাকার এইসব সাপের পক্ষে সেইসব প্রাণীদের শিকার করা মোটেই অস্বাভাবিক নয় যেগুলো পানি পান করতে নদীতে আসে বুনো শূকর, তীক্ষ দাঁতের ক্যাপিরা কাঠবিড়ালী, বুনো হরিণ। কিন্তু মানুষদের সাধারনত আক্রমণ করে না এই বৃহদাকার সাপেরা । জল ও বনে ঘেরা এই আমাজনে একজন এথনোবোটানিস্ট হিসেবে গত এক দশক ধরে কাজ করতে গিয়ে নাথান র্ ্যান্ড একটি বিষয় বেশ ভালভাবেই শিখতে পেরেছে : যখন কোন জন্ত তীব্র ক্ষুধার্ত হয়ে যায় তখন সব নিয়ম ভেঙে পড়ে। এই সীমাহীন সবুজের সাগরে তখন পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়ায় খাও অথবা খাবার হও। পরিস্কারভাবে দেখার জন্য বন্দুকের গান-সাইটের মধয়ে তীক্ষ দৃষ্টি হানল নাথান। “ওহ্ গড়, টামা!” মেয়েটিকে চিনতে পারল সে ।নবছর বয়সী মেয়েটি স্থানীয় এক গোত্রীয় প্রধানের ভায়ের মেয়ে। মাসখানেক আগে নাথানের এই গ্রামে আসা উপলক্ষে এই হাসিখুশি মেয়েটি তাকে ফুলের তোড়া দিয়েছিল উপহার হিসেবে। পরে তার হাতের উপর বসে মেয়েটি নাথানের চুল ধরে টানাটানি করেছিল। মসৃণ ত্বকের ইয়ানামোমোদের মধ্যে তার কোমলতা ছিল দূর্লভ পর্যায়ের। মেয়েটি তাকে একটা নামও দিয়েছিল, জ্যাকো ব্যাসো – বানর ভাই।

নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে সে তার অস্ত্রে বসানো লেন্সের মধ্যে দিয়ে ওদেরকে দেখতে লাগল। পরভোজীটা পেশীবহুল শরীর দিয়ে মেয়েটিকে পেঁচিয়ে রেখেছে। ওটাকে সরাসরি গুলি করার চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে রাখতে হল নাথানকে।

‘ধুর শালা!” শটগান ফেলে দ্রুত কোমরের বেল্টে গোঁজা বড় ছুরিটা হাতে নিয়েই সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। কিন্তু কাছে যেতেই মেয়েটিকে পুরোপুরি পেঁচিয়ে ধরে নদীর কালো পানিতে ডুবে গেল সাপটি। থেমে গেল তার চিৎকার, বুদবুদ উঠতে লাগল তার ডুবে যাওয়া জায়গা থেকে ।

কোনকিছু চিন্তা না করেই নাথান ঝাপ দিল পানিতে। আমাজনের ভালোপথগুলোই এটার অন্যসব পরিবেশ থেকে বিপজ্জনক। শান্তশিষ্ট পানির নিচে ঘাপটি মেরে থাকে অগণিত বিপদ। হাঁড়খেকো পিরানহা মাছের ঝাঁক একদিকে যেমন গভীর পানিতে চষে বেড়ায় অন্যদিকে কাদার মধ্যে গা-ঢাকা দিয়ে থাকে স্টিং-রের মত চ্যাপ্টা মাছ যা মেরুদন্ড দিয়ে প্রচন্ড বেগে আঘাত করতে পারে শত্রুকে। আর ডুবন্ত গাছের গুঁড়ি বা শেকড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইলেকট্রিক ইল বা বাইন তো আছেই। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে পানির নিচে মানুষের সত্যিকারের খুনি হল দৈত্যাকার কুমিরের মত সরীসৃপের দল। এইসব বিপদ-আপদের কথা আমাজনের ইন্ডিয়ানরা এই অচেনা-অদেখা পানির জগতে ডুব না দিলেও ভালই জানে। কিন্তু নাথান কোন ইন্ডিয়ান নয় ।

শাস বন্ধ করে ঘোলা পানিতে ডুব দিতেই নাথান পেঁচানো সাপটির অবস্থান বুঝতে পারলো । দুর্বল একটা বাহু দুলছে সেখানে। পা দিয়ে মাটিতে এক ধাক্কা দিতেই ছোট হাতটার কাছে পৌছে গেল সে। শক্ত করে ধরে নিয়ে উপরে তুলল হাতটা । নাথানকে জাপটে ধরার জন্য হাতটাও যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে। টামার চেতনা এখনও আছে। মেয়েটির হাত ব্যবহার করেই নিজেকে সাপটার কাছে টেনে নিল নাথান। অন্য হাত দিয়ে ছুরিটা পেছনে গুজে নিল সে। একদিকে পা দিয়ে মাটি ঠেলে রাখতে হচ্ছে নিজের জায়গা ধরে রাখতে অপরদিকে টামার হাত ধরে টেনে বের করার প্রচেষ্টা।

হঠাৎ সামনের কালো পানিতে একটা ঘুর্ণি উঠলো, নাথান আবিষ্কার করল দৈত্যাকার সাপটি তার দিকে রক্তিম চোখে খুনে দৃষ্টি হানছে। নিজের আহার টিকিয়ে রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হল যেন সাপটিকে। ওটার কালো মুখগহ্বর খুলে যেতেই আহড়ে পড়ল নাথানের উপর। আঘাত এড়াতে একটু পাশে সরে গেল নাথান। মেয়েটির এত ধরে রাখতে তাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে।

অ্যানাকোন্ডাটি এবার নাথানের বাহুতে কামড় বসিয়ে খুব জোরে চোয়াল দিয়ে চেপে ধরল । যদিও এটার কামড় বিষাক্ত নয় কিন্তু হাতে যে অস্বাভাবিক চাপ পড়ছে তাতে তার কজি ভেঙে যাবার উপক্রম হল। পাহাড় সমান ভয় আর তীব্র ব্যাথা উপেক্ষা করে নাথান আরেক হাত দিয়ে ছুরি ঘুরিয়ে এনে সোজা তাক করল সাপটির চোখ বরাবর।

একেবারে শেষ মুহূর্তে বিশাল অ্যানাকোন্ডাটি নাথানকে পেঁচিয়ে ধরে নদীর তলায় নিয়ে কাদার মধ্যে চেপে ধরল । মাংসপেশীর সহ্যক্ষমতার প্রায় চারশ পাউন্ড চাপের ফাঁদে আটকা পড়তেই নাথানের মনে হল তার ফুসফুস ফেটে বাতাস বের হয়ে যাবে। সে লড়ে যাচ্ছে সাপের সাথে কিন্তু নদীর পিচ্ছিল কাদার মধ্যে ধরার মত কিছুই পেল না ।

এদিকে সাপের পেঁচানো অংশ একটু ওপরে উঠে যেতেই নাথানের হাত থেকে মেয়েটার আঙুলগুলো ছুটে গেল। না…টামা!

সে হাত থেকে ছুরিটা ছেড়ে দিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে সাপটার বিশাল দেহ থেকে মুক্ত করতে চাইল । নদীগর্ভের নরম কাদায় তার কাঁধ ডুবে গেল কিন্তু নাথান হাল ছাড়ল না একটুও। প্রচন্ড শক্তি দিয়ে সে একেকটা প্যাচ খুলছে তো আর আরেকটা প্যাচ পড়ছে আগের জায়গায়। তার বাহুগুলো যেন আর চলে না, একটু বাতাসের জন্য তার ফুসফুস চিৎকার করছে যেন। ঠিক এই মুহূর্তটায় নাথান বুঝতে পারলো, তার এমন বিপদে পড়াতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ সে জানত তার ভাগ্য তাকে এমন দন্ডই দিয়ে রেখেছে-এটাই তার নিয়তি, তার পরিবারের অভিশাপ। বিগত বিশ বছরে তার বাবা-মাকে এই আমাজন বন গিলে খেয়েছে । তার বয়স যখন এগার, তার মা এই জঙ্গলের অজানা এক জ্বরে ঘায়েল হয়ে মিশনারির এক ছোট্ট হাসপাতালে মারা যায় । তারপর চার বছর আগে তার বাবা জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে যায় একেবারে সবার অগোচরে ।

বাবাকে হারানোর কষ্টের কথা মনে উঠতেই নাথানের বুকে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠলো। অভিশাপ হোক আর যাই হোক, সে তার বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাইলো না মোটেই। কিন্তু সেটার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো টামাকে হারাতে চায় না সে।

নাথান পা দিয়ো অ্যানাকোন্ডার বিশাল দেহটা একটু ঠেলে দিল। এক মুহূর্তের জন্য মুক্ত হতেই পা দোলাতে লাগলো উপরে ওঠার জন্য। এদিকে গোড়ালি পর্যন্ত পা ডুবে গেছে কাদায়। ফুসফুসের আটকে পড়া বাতাসটুকু বের করে দেওয়ার জন্য ছটফট করছে নাথানের বুক। আর একটা ধাক্কা দিতেই সরাসরি তার মাথাটা পানির উপর তুলতে পারলো । মুক্ত বাতাসে বুকভরে শ্বাস নিয়েই আমাজনের এই কালো পানিতে আবারও ডুব দিল সে।

এবার সাপটার সাথে সরাসরি কোন যুদ্ধে গেল না। একটা হাত বুকের সাথে শক্ত করে ধরে রেখে পেঁচানো অংশে ঢুকে গেল। শ্বাসরোধ করার জন্য আরেক হাতে দিয়ে সাপটার গলা বরাবর দিল এক প্যাঁচ। বেশ কাজ হলো এতে। সাপটাকে ফাঁদে ফেলতেই নাথান ওটার চোখ বরাবর বা-হাতের বুড়ো আঙুলটা সজোরে বসিয়ে দিল । তীব্র যন্ত্রণায় নাথানকে নিয়ে পানির উপর দলা পাকিয়ে ঠেলে উঠলো সাপটি। মুহুর্তের মধ্যেই পানিতে ঝপাত করে আছড়ে পড়লো আবার। নাথানও নাছোড়বান্দা। ধরেছে তো ধরেছেই, একেবারে শক্ত করে। বানচোত, উঠে আয়!

সে তার হাতের কব্জিটা একটু ঘোরালো। তারপর ঐ হাতটার বৃদ্ধাঙ্গুল বসিয়ে দিল সাপের অবশিষ্ট চোখে। দু-পাশেই সমান চাপ দিল নাথান। সরীসৃপলে সাইকোলজি নিয়ে ট্রেনিঙের সময় নাথান যা শিখেছিল তা-ই সত্য হতে দেখল কোন সাপের দু-চোখে চাপ দেয়া মানে ওটার চোখ আর মস্তিষ্ক সংযোগকারী স্নায়ুর মধ্যে গোঁজ ঢুকিয়ে দেওয়ার সূত্রপাত করা । আরও জোরে চাপ দিতে থাকলো নাথান। এদিকে হৃদপিণ্ডের ধকধক শব্দ কানে বেজে চলেছে।

হঠাৎ তার কজি চাপমুক্ত হয়ে গেল, সাপটি নাথানকে এত দ্রুত আর এত জোরে নদীর পাড়ে ছুঁড়ে মারল যে তার শরীরের উপরের অংশ গিয়ে আছড়ে পড়ল কাদায়। মাথা ঘুরিয়ে একটু এদিক-সেদিক দেখতেই কাদার মধ্যে উপুড় হয়ে থাকা আবছা কিছু একটা চোখে পড়ল যুদ্ধজয়ী নাখানের।

টামা! যেমনটি আশা করেছিল, সাপটার অস্ত্রে চাপের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার খেলাই তাদের দুই বন্দীকে মুক্ত করে দিয়েছে। নাথান ঝাপিয়ে পড়ে দু-হাত দিয়ে মেয়েটার নিথর দেহ নিজের দিকে টেনে নিল। কাঁধে ঝুলিয়ে দ্রুত ছুটল নিরাপদ স্থানের দিকে। তার ভেঁজা শরীরটা পাড়ের মাটির উপর ছড়িয়ে দিল সে। মেয়েটির শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ, ঠোঁট দুটো একেবারে রক্তবর্ণ। নাথান তার নাড়িস্পন্দন পেল ঠিকই কিন্তু বেশ দুর্বল।

সাহায্যের জন্য অসহায়ভাবে একটু এদিক-সেদিক চোখ বুলাল। কেউ নেই আশেপাশে । এখন মেয়েটির পুণর্জীবন পাওয়াটা নাথানের উপরেই নির্ভর করছে। ঝুঁকিপূর্ণ জঙ্গল ভ্রমণের আগেই নাথানকে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং সিপিআর (কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেইশন) সম্বন্ধে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু নাথান কোন ডাক্তার নয়। হাটু গেঁড়ে মেয়েটিকে উপুড় করে দিয়ে পিঠে হাত রেখে কয়েক বার চাপ দিতেই নাক-মুখ দিয়ে কিছু পানি ছিটকে বেড়িয়ে এল। এবার তাকে ঘুরিয়ে চিৎ করে দিয়ে মেয়েটির মুখ দিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে দিল হৃদপিণ্ড সচল কার জন্য। ঠিক এই মুহূর্তে মধ্যবয়সী এক ইয়ানামামো মহিলা জঙ্গল থেকে বের হয়ে এলো । আর সব ইন্ডিয়ানদের মতই তার উচ্চতাও ছিল পাঁচ ফুটের নিচে । গতানুগতিক বাটি ছাঁট চুল, কানে পালক ও বাঁশের তৈরি দুল। সাদা চামড়ার একজন মানুষকে ছোট একটি বাচ্চার উপর ঝুঁকে থাকতে দেখে মহিলার চোখ বড় বড় হয়ে গেল ।

নাথান জানত ব্যাপারটা দেখতে কেমন লাগবে। টামার হঠাৎ করে চেতনা ফিরে আসা শুরু করতেই দ্রুত উঠে দাঁড়াল সে। ব্যাথার বহিপ্রকাশ ঘটানো ছোট ছোট কাশি দিতেই তার মুখ দিয়ে কিছুটা পানি বের হয়ে এল। ছোট হাত দিয়ে নাথানকে খামচে ধরে রইলো মেয়েটি-সাপের আতঙ্ক চোখেমুখে । এখনও সেটা কাটে নি।

“এখন তুমি নিরাপদ, সোনা,” ইয়ানামামো ভাষায় বলে মেয়েটির হাত শক্ত করে ধরার চেষ্টা করল নাথান তারপর সবকিছু ব্যাখ্যা করার জন্য মহিলার দিকে ঘুরল, খাটো ইন্ডিয়ান তার বাস্কেট ফেলে দৌড়ে ঘন জঙ্গলে হারিয়ে গেছে ততোক্ষণে, তবে নির্বাক থাকলো না সে। বিশেষ এক ধরনের চিকার করতে থাকলো। নাথান জানে এই সংকেতের মানে কি-যখন গ্রামের কেউ আক্রমণের শিকার হয় তখনই এই সংকেত দেওয়া হয়।

“দারুণ, আসলেই দারুণ,” চোখ দুটো বুজে ফেলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নাথান।

প্রবীণ সামানের কাছ থেকে চিকিৎসাবিষয়ক জ্ঞান অর্জন করার জন্য নাথান চার সপ্তাহ আগে প্রথম যখন এই গ্রামে আসে দলীয়প্রধান তাকে স্থানীয় মহিলাদের থেকে দূরে থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। অতীতে এমন সুযোগ ছিল যখন আগন্তুকেরা স্থানীয় মহিলাদের ভোগ করার সুযোগ গ্রহণ করত। নাথান সেই অনুরোধের সম্মান রেখেছে। এমনকি কিছু নারী তাদের বিছানা নাথানের সাথে ভাগাভাগি করার জন্য অত্যুত্সাহী থাকার পরও। তার ছয় ফুটের চেয়ে বেশি শারিরীক কাঠামো, নীল চোখ আর সোনালী চুল সবকিছুই নতুনত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিল এইসব মহিলাদের কাছে ।

কিছুটা দূরে, দৌড়ে পালানো মহিলার চিৎকারে সাড়া দিল বেশ কয়েকজন ইয়ামোমামো। স্থানীয়ভাবে ইয়ানামামোদেরকে দূর্ধর্ষ জাত’ বলেও ডাকা হয়। আগে এই গোত্রের লোকজনকে বর্বর যোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করা হত ।গ্রামের হুইয়াস’ বা তরুণেরা বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ প্রকাশ্যেই তুমুল যুদ্ধে উপনীত হত কখনও প্রতিবেশী গোত্রের সাথে, কখনও বা নিজেদের মধ্যেই। আর এই বিবাদের কারণ হিসেবে থাকত তাদের উপর আরোপিত অভিশাপ মোচনের ব্যাপারটি অথবা সম্মানের আসন ধরে রাখা। কারো নাম ব্যঙ্গ করে বলার মত ছোটখাট অপমানসূচক কাজকে কেন্দ্র করে মারামারি বাধিয়ে পুরো গ্রাম ছারখার করে দেয়ার মত নজিরও এদের আছে।

নাথান বড়বড় চোখ করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলো। এই ব্যাপারটিকে হুইসরা কিভাবে নেবে যেখানে এক সাদাচামড়ার মানুষ তাদেরই গোত্রের তাদেরই প্রধানের ভাইঝিকে আহত করেছে। নাথানের পাশেই টামা শুয়ে আছে। মেয়েটার আতঙ্ক ধীরে ধীরে কাটতে থাকলেও কিছুক্ষণ পরপর ক্লান্তি তাকে অচেতন করে ফেলছে। তার শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়মিতই হচ্ছে কি নাথান যতবারই তার কপালে হাত রাখছে ততবারই ধেয়ে আসা জ্বরের উপস্থিতি বুঝতে পারছে সে। হঠাৎ তার চোখ গেল মেয়েটির শরীরের ডান দিকটাতে। কালচে হয়ে থাকা বুকের পাঁজরে হাত বুলাতেই নাথান বুঝতে পারলো অ্যানাকোন্ডা তার বিধ্বংসী চাপ দিয়ে টামার দুটি হাঁড় ভেঙে দিয়ে গেছে । নিচের ঠোট কামড়ে ধরে নাথান গোড়ালির ওপর ভর করে বসে পড়তেই অসহায়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মেয়েটিকে বাঁচাতে হলে এখনই চিকিৎসা দিতে হবে। মেয়েটিকে দু-হাতে তুলে নিল নাথান। সবচেয়ে কাছের হাসপাতালটি সাও গ্যানিয়েলের ছোট্ট এক শহরে, আর সেটাও নদীপথে নিদেনপক্ষে দশমাইল দূরের । তবু টামাকে সেখানেই নিতে হবে।

কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম হলো ইয়ানোমামো । কোন রাস্তা দিয়েই মেয়েটিকে নিয়ে দূরে যেতে পারবে না, পালানো তো দূরের কথা। এটা হলো ইন্ডিয়ানদের ভূখন্ড। নাথান এই ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কে ভাল না জানলেও কিছুই যায় আসে না। কারণ সে তো তাদের কেউ না। এই আমাজনজুড়ে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে না বোয়েসি, ইঙ্গি আল সানি। এই জঙ্গলে ইন্ডিয়ানরা সবকিছুই জানে। পাশাপাশি এরা অসাধারণ শিকারী, তীর-বর্শা-লাঠি ছোঁড়ায় দক্ষ আর ব্লো-গান তো আছেই পার্লানোর কোন রাস্তা নেই তার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন