Below Post Ad

অন্যরকম_ভালোবাসা পর্ব (১০ - শেষ)

অন্যরকম_ভালোবাসা

 পর্ব  ১০



*** নিরব মনির সাথে কথা বলেছে কালকে একটা কাজ শেষ করেই মনি বাংলাদেশে ফিরবে। মনি এখন বাংলাদেশের বাহিরে গেছে একটা কাজে। নিরবের চিন্তা হচ্ছে কাল তো মনি বিয়ের আগে আসতে পারবে না তাহলে বিয়েটা আটকাবে কি করে। এটা নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে নিরব আবার বলে উঠে, –” কোনো ব্যাপার না হয়ে যাক বিয়ে আবার ডিভোর্স ও হয়ে যাবে। ”
নিরব রিক্সা নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিল সে। তন্নিকে পাবে এই আনন্দে তার নাচতে ইচ্ছে করছে। যখন সে তন্নিকে বিয়ে করে আনবে একটা বড় করে পার্টি দিবে।
———–
সকাল ১০ টা বাজে চারিদিকে সবাই ব্যস্ত। তন্নি নিজের রুমে একা বসে আছে। মনটা কেমন যেন করছে। কোনো ঝামেলা হবে না তো নিরবের সকল প্ল্যান জানার জন্য সে বৃষ্টিকে সহ্য করতো। কিন্তু নিরব কি করতে চলছে সেটাই তো বৃষ্টি জানে না। যা হবার হয়েছে সে তার নতুন জীবনে বৃষ্টি বা নিরবের কারো ছায়া পড়তে দিবো না।
এসব ভাবতে ভাবতে আবার কলটা বেজে ওঠে। তন্নি ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে বৃষ্টি। বিরক্ত হয় সে আর কতো সহ্য করতে হবে এদের। ফোন রিসিভ করে কানে ধরে বলতে থাকে, –” প্লিজ তোর পায়ে পড়ি আমাকে আর কল দিস নাহ। তোরা দুজন আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দে।”
তখন ফোনের ওপাশ থেকে নিরব বলে ওঠে, থাকবে তো শান্তিতে তুমি আর আমি শান্তিতে থাকবো। আর এখন থেকে বৃষ্টি আর কল দিয়ে তোমায় বিরক্ত করবে নাহ। আমাকে ছেড়ে দিতে বলে জ্বালাতো অনেক তাই নাহ।”
তন্নি দাঁতে দাঁত চিপে বলল– ” তোর সাহস কি করে হলো আমায় কল দেওয়ার!”
নিরব বেহায়া হাসি দিয়ে বলে,–” আমি দেই নও তো বৃষ্টি দিয়েছিল আমি শুধু ওর কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে কথা বলছি সোনা।”
নিরবের কথায় কপাল কুচকে ফেলে। কান থেকে ফোনটা সরিয়ে এক আঁচড়ে ফোনটা ভেঙে ফেলে। কি চাই এই দুইজন কেন তার পিছু ছাড়ছে না। তখনই দরজা টেলে রুমে ঢুকেন তুষার সাহেব। তুষার সাহেবকে দেখে তন্নি নিজেকে কন্ট্রোল করে নেয়। তন্নি মুখে হাসি নিয়ে বলে, –” বাবা তুমি!”
তুষার সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,–” হ্যা আসলাম তোর সাথে গল্প করতে একটু।”
তন্নি তার বাবাকে বসার জায়গা করে দিয়ে তার পাশে সেও বসে। তুষার সাহেব তন্নির মাথায় হাত দিয়ে বলে,–” মা আমায় ক্ষমা করে দিস আমার ভুলের জন্য তুই এতো কষ্ট সহ্য করেছিস।”
তন্নি সাথে সাথে বলে,–” কি বলছো এসব বাবা তুমি কোনো ভুল করো নি তুমি তো আর জানতে না ও এমন হবে। ”
তুষার সাহেব মেয়েকে আরো কিছু বলতে যাবে তখন পার্লার থেকে লোক চলে আসে তাকে সাজাতে। তুষার সাহেব ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১ টা বাজে। উনি মুচকি হেসে বলে, –” দেখ তো এখন কয়টা বেজে গেছে কিভাবে যে সময়টা চলে যাচ্ছে। ”
তন্নিও হালকা হাসলো। দুজনের চোখেই পানি চিকচিক করছে। তুষার সাহেব বেশিক্ষণ থাকলেন নাহ এখানে চলে গেলেন বেরিয়ে। এখানে থাকলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারবে না।
———
নিরব বেরিয়ে যাচ্ছিল বাসা থেকে তখন বৃষ্টি তার সামনে এসে দাঁড়ায়। নিরব বিরক্ত নিয়ে তার দিকে তাকায়। বৃষ্টি আকুতি ভরা চোখ নিয়ে বলে,–” প্লিজ তোমার সাথে কিছু কথা আছে। ”
নিরব গম্ভীর গলায় বলে, –” আমার হাতে তোমার ফালতু কথা শোনার মতো সময় নেই।”
বৃষ্টি অসহায় চোখ করে তাকায়। নিরব তা পাত্তা না দিয়ে চলে যেতে নিলেই বৃষ্টি ওর হাত ধরে বলে, –” প্লিজ এটা খুব দরকার বলা।”
নিরব হাত ঝাড়ি মেরে ফেলে দিয়ে বলে– ” রাতে এসে শুনবো।”
এই বলে বড় বড় পা ফেলে সে চলে যায়। বৃষ্টির খুব আফসোস হয় এখন। কেন যে সে তন্নির সংসারটা ভাঙতে গিয়েছিল এখন তো তার নিজের সংসারে ফাটল ধরেছে। এখন আর আফসোস করে কি লাভ কর্ম ফল তো পেতেই হবে।
————–
বিদায় শব্দটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক। তন্নির বিদায় ঘনিয়ে এসেছে। তাকে যে এখন বাবার বাড়ি ছেড়ে রওনা দিতে হবে শ্বশুর বাড়ির পথে। বিয়েটা সুষ্ঠু ভাবেই সম্পুর্ন হয়েছে তাদের। তন্নির চোখে পানি জমেছে এখনই যেন টুপ করে পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়বে। তুষার সাহেব মেয়ের হাত রাদের হাতে সঁপে দিয়ে বলে– ” আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো ও খুব সহজ সরল।”
তুষার সাহেব নিশ্চিন্ত হলেন কোনো বাধা বিপত্তি ছাড়াই বিয়েটা সম্পূর্ণ হয়েছে। তন্নির বিদায়ের পালা মিশমি আচল দিয়ে মুখ ঢেকে কান্না করছেন। তুষার সাহেব নিজেকে শক্ত করে রেখেছেন। তন্নি কাঁদছে মা বাবাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না।
অবশেষে তারা রওনা দিল রাদের বাসার উদ্দেশ্যে। তন্নি সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে তার কোলে গুটিশুটি মেরে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে রাইদা আর তার দুইপাশে র এক পাশে বসে আছে রাদ অপর পাশে রিধি। বাসায় পৌঁছাতে তাদের ৩০ মিনিটের মতো লাগে।
দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে রাদ আর তন্নি। রিধি ভিতরে গেছে বরণ ডালা আনতে। ৫ মিনিট পর রিধি বরণ ডালা এনে ওদের দুজনকে বরণ করে ভিতরে নিয়ে আসে।
———————
নিরব এয়ারপোর্টে বসে আছে মনির অপেক্ষায়। ১১:৩০ এ ফ্লাইট ল্যান্ড করবে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১১:২৫ বাজে। নিরব বিরক্তির নি:শ্বাস ছাড়ে। ৫ মিনিট সময়ও এখন ৫ ঘন্টার সমান মনে হচ্ছে। তন্নি আর রাদের বিয়ে হয়ে গেছে মনে হতেই কপাল কুচকে ফেলে নিরব।
মনি মাত্রই ফ্লাইট থেকে নেমেছে। একটা লোককে পায়চারি করতে দেখে। পড়নে তার টি-শার্ট আর প্যান্ট। মনি ঐ লোকটার কাছে গিয়ে বলে,–” আপনি কি নিরব?”
মেয়েলি গলা পেয়ে পিছনে তাকায় নিরব। শর্ট ড্রেস পড়া চুলের কালার বাদামী পড়নে হাই হিল। নিরব বলল,–” হ্যা আমি নিরব।”
মনি হালকা হেসে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে– ” আমি মনি।”
নিরবও হাত মেলায়। মনির লাগেজ গুলো নিয়ে নিরব বলে,–” চলুন হোটেলে যাবেন। ”
মনি বলল,–” না না আগে চলুন রাদ আর তন্নির বিয়ে ভাঙতে হবে। ”
নিরব ত্যাড়া ভাবে বলে,–” ওহ তাই আপনি ওদের বিয়ে ভাঙবেন এই আশায় ওরা বিয়ে আটকিয়ে রেখে বসে আছে তাই নাহ?”
মনি বুঝতে না পেরে বলে,–” মানে?”
নিরব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে– ” ওদের বিয়ে হয়ে গেছে। ”
মনি চিৎকার দিয়ে বলে,–” হোয়াট তাহলে আমার এখানে এসে ফাইদা হলো কি তাহলে?”
নিরব বলল,–” আস্তে আমার কাছে প্ল্যান আছে চলুন হোটেলে ঐখানে বসেই বলবো সব।”
মনি আর কিছু বলল না নিরবের পিছু পিছু যেতে লাগলো। মনি ৩ বছর আগে রাদকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল তার নতুন বয়ফ্রেন্ড এর জন্য কিন্তু সেই বয়ফ্রেন্ড তার সাথে রুমডেট করার পর তাকে ছেড়ে চলে যায় পরে রাদের কাছে ফিরতে চাইলেও সে তাকে গ্রহণ করে নি। কয়েকদিন আগে একটা কাজে দেশের বাহিরে গেছে তো এর মাঝে এতো কিছু হয়ে গেছে।
——————–
রাদ আর তন্নি ছাদে দাড়িয়ে আছে। আজ তার মনে ভীষণ শান্তি লাগছে। রাদের বুকে মাথা রেখে দাড়িয়ে আছে তন্নি কেমন একটা যেন শান্তি লাগছে। তবে কি সে রাদকে ভালোবাসতে শুরু করেছে।
এসব ভাবছিল তখন রাদ বলল,–” তুমি খুশি তো মিসেস তন্নি।”
তন্নি হালকা হেসে বলে, –” হুম অনেক খুশি।”
রাদ জিজ্ঞেস করল, –” ক্লান্ত লাগছে?”
তন্নি চোখ দুটো ছোট করে মাথাটা নাড়িয়ে বলে, –” একটু একটু।”
তন্নির এমন কথা বলার ধরণ দেখে আরেক দফা ফিদা হয়ে যায় রাদ। এই এক অন্যরকম অনুভূতি, অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছে। তন্নি আর রাদ দুজনই রুমে চলে আসে। তন্নি অস্বস্তি ফিল করছে দেখে রাদ বলে,–” নো প্রবলেম আমি সোফায় শুয়ে পড়ছি তুমি বিছানায় শুয়ে পড়ো কাল থেকে রাইদাও থাকবে তোমার সাথে।”
তন্নি কিছু বলল নাহ তার শরীর ভীষণ ক্লান্ত। চোখ দুটো বিশ্রাম চাচ্ছে। রাদ বিছানা থেকে বালিশ নিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ে। তন্নি হালকা ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম তার চোখে ভর করে। সে ঘুমে তলিয়ে যায়। তন্নি ঘুমিয়ে যাওয়ার পর রাদ উঠে এসে তন্নির পাশে বসে। এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে সে তন্নির দিকে। মনটা আজ ভীষণ শান্তি লাগছে ইচ্ছে করছে বুকে জড়িয়ে ঘুমাতে কিন্তু তন্নির মনে তো ওর জন্য কোনো ফিলিংস নেই তাই সে আনার গিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ে।


পর্ব  ১১ 


*** বৃষ্টি নিরবের জন্য অপেক্ষা করছে রাত ১ টা বাজে তখন। নিরব একটু পর বাসায় আসে। নিরবকে দেখে খুশি হয়ে যায় বৃষ্টি। বৃষ্টি এখনও জেগে আছে দেখে বিরক্ত হয় নিরব। বৃষ্টি বলল,–” তুমি এসেছো নিরব!”
নিরব ত্যাড়া ভাবে বলল,–” হ্যা তো?”
নিরবের ত্যাড়া উত্তরে মন খারাপ হয়ে গেল বৃষ্টির। মাথা নিচু করে বলে– ” আসলে কিছু কথা ছিল। ”
নিরব বিরক্ত হয়ে বলল,–” বল।”
বৃষ্টি বলল,–” তুমি বাবা হতে চলেছো। ”
এই বলে বৃষ্টি অধীর আগ্রহে নিরবের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই বুঝি নিরব এসে ওকে জড়িয়ে ধরে বলবে,” বৃষ্টি জান আমার তুমি সত্যি বলছো কি আমাদের পিচ্চি আসতে চলছে! ”
কিন্তু এটা হলো না। হলো এটার বিপরীত টা শান্ত গলায় বলল নিরব,–” রেডি থেকো কাল এবরেশন করিয়ে আনবো।”
বৃষ্টি বলল,–” হোয়াট? ”
নিরব আবারও বলল,–” এবরেশন করিয়ে আনবো। ”
বৃষ্টি রেগে গেল। নিরবের কলার ধরে বলে– ” এবরেশন করাবো মানে?”
নিরব শান্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,–” এই বাচ্চা আমার চাই নাহ।”
বৃষ্টি কলারটা আরও চেপে ধরে বলে– ” আমাকে খেলনা মনে হয় তোমার তন্নিকেই যদি চাও তাহলে খনিকের জন্য আমাকে তোমার সাথে জড়ালে কেন? ”
নিরব এক ঝাড়া দিয়ে নিজের কলার থেকে বৃষ্টির হাতটা সরিয়ে ফেলে। বৃষ্টির গালে জোরে একটা চর মারে সেখান থেকে চলে যায় নিরব। বৃষ্টি সেখানেই বসে পড়ে। চিনিয়ে নেওয়া কোনো কিছুর স্থায়িত্বকাল বেশিদিন হয় নাহ তা সে বেশ বুঝতে পারছে। সে কি করবে বুঝতে পারছে না সে ত বাচ্চাটাকে বাচাতে চায়।
———-
সকাল ৭ টা বাজে তন্নি মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। রাদকে সোফায় শুয়ে থাকতে দেখে মায়া হয়। ঠিক কর শুতেও পারছে না বারবার পড়ে যেতে নিচ্ছে। তন্নি উঠে গিয়ে রাদকে ডেকে বলে, –” এই যে মিস্টার যান গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ুন। ”
রাদ ঘুম ঘুম ঢুলতে ঢুলতে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। তন্নি গিয়ে তার পাশে বসে। রাদ চোখ বন্ধ করে বলে,–” কিছু বলবে মিসেস তন্নি।”
তন্নি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে বলল,–” আসলে আজকে থেকে আপনি বিছানায় শুবেন। বিছানা তো অনেক বড় বড় আমরা তিনজন খুব সুন্দর হয়ে যাবে। ”
এতটুকু বলে তন্নি বোকা বোকা চোখ করে রাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাদ চোখ পিটপিট করে তন্নির মুখের অবস্থা দেখে ঠোঁট মেলিয়ে হেসে বলে, –” এরকম কিউট ফেইস করো না নিজেকে কন্ট্রোল করতে কষ্ট হয়।”
রাদের কথার মানে বুঝতে একটু সময় লাগে ততক্ষণে রাতে গভীর ঘুমে। রাদের কথার মানে বুঝতে পেরে মুখ দিয়ে একটা শব্দই বের হয় তা হলো অসভ্য।
তন্নি ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এসে দেখলো রিধি রান্না করছে আর রাইদা টিভি দেখছে আর খেলা করছে। তন্নি রাইদাকে আদর করে রিধির কাছে যায়। রিধি তন্নিকে দেখে হেসে বলে, –” গুড মর্নিং ভাবি।”
তন্নিও হালকা হেসে বলে, –” গুড মর্নিং। দাও আমি করছি তুমি রাইদার সাথে বসো গিয়ে। ”
রিধি বলল, –” না কোন সমস্যা নেই মিষ্টি ভাবি তুমি যাও আমার শেষ প্রায়। ”
তন্নি ধমকে বলল,–” চুপ মেয়ে যাও গিয়ে টিভি দেখো আমি করছি বাকি গুলো।”
ধমক খেয়ে রিধি আর কিছু বলে না গাল ফুলিয়ে গিয়ে টিভি দেখতে থাকে। রিধির গাল ফুলানো দেখে তন্নি হাসে।
তন্নি অনেক রকম খাবার তৈরি করে। রান্না করতে করতে ১০ টা বেজে যায়। রাইদার জন্য দুধ গরম করে রিধির হাতে দিয়ে আসে তন্নি। দুধ দেখে রাইদার হাজার বাহানা শুরু রিধি হাজার চেষ্টা করেও দুধ খাওয়াতে পারলো না। তন্নি এসে রিধির কাছ থেকে দুধের গ্লাস টা নিয়ে বলে,–” আমি খাওয়াচ্ছি।”
রিধি একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলে– ” দেখো এই ত্যাড়া মেয়েকে খাওয়াতে পারো কিনা।”
তন্নি হালকা হেসে রাইদার কাছে গিয়ে বসল,–“রাইদা মনি কি দুধ খাবে নাহ?”
রাইদা নাক ছিটকে বলে, –” নাহ খাবে না।”
তন্নি মন খারাপ করে বলে, — ” মাম্মাম খাইয়ে দিলেও খাবে নাহ?”
রাইদা অসহায় ফেইস করে বলে, –” রাইদার দুধ একদম পছন্দ না।”
তন্নি বলল,–” তাহলে রাইদার কি পছন্দ?”
রাইদা লাফিয়ে বলে,–” চকলেট। ”
তন্নি উঠে দুধ আর চকলেট মিক্সড করে গরম করে আনলো। এবার রাইদা বাহানা করলো নাহ খেয়ে নিল। রাদ এতক্ষণ পিছনে দাড়িয়ে তন্নি আর রাইদার কাজ দেখছিল। ওদের কান্ডে রাদ হালকা হাসলো। তবে কি তার সুখের সংসার শুরু নাকি নতুন কোনো ঝড় আবার আসবে।
——————-
নিরব বৃষ্টিকে অনেকবার বলে গেছে রেডি হতে কিন্তু বৃষ্টি সেই একইভাবে বসে আছে। নিরব এবার এসে বৃষ্টিকে একইভাবে বসে থাকতে দেখে প্রচন্ড রেগে যায়। বৃষ্টির কাছে গিয়ে তার হাতে ধরে টেনে তুলে গালে থাপ্পড় মারে। বৃষ্টি ছিটকে গিয়ে বিছানায় পড়ে। নিরব আবার বৃষ্টির চুলের মুঠি ধরে তোলে। বৃষ্টি অস্পষ্ট সুরে বলে,—” নিরব আমি প্র্যাগনেন্ট।”
নিরব রাগে দাতে দাত চেপে বলে,–” হ তুই প্র্যাগনেন্ট এখন তুই যাবি আমার সাথে এবরেশন করাতে। ”
বৃষ্টি রেগে যায় চুল থেকে হাত ছাড়িয়ে জোরে থাপ্পড় মারে নিরবকে। নিরবকে থাপ্পড় মেরে বলে,–” ফাইজলামি পেয়েছিস এটা আমার বাচ্চা। তোকে পালতে হবে না আমি পালবো ওকে। ”
নিরব আবার বৃষ্টির চুলের মুঠি ধরে বলে– ” বাচ্চার মাধ্যমে আমার উপর অধিকার খাটাতি নাকি?”
বৃষ্টি নিরবের পায়ে পড়ে বলে, –” আমি কখনো কোনো দাবি নিয়ে আসবো না তোমার কাছে প্লিজ আমার সন্তানটাকে মেরো না।”
বৃষ্টির কথায় নিরব হেসে উঠে বলে, –” তোর মতো মেয়েকে বিশ্বাস করা যায় না যেই দশ বছরের বন্ধুত্বের সাথে বেইমানি করে সে আমার সাথে বেইমানি করবে না তার কি গ্যারেন্টি জলদি উঠ। উঠে রেডি হয়ে নে হাসপাতালে যাবো।”
বৃষ্টি বলে,–” আমি যাবো নাহ হাসপাতালে। ”
নিরব প্রচন্ড রেগে যায়। বৃষ্টিকে মারতে শুরু করে। তার একটা আঘাত অনেক জোরে এসে পেটে লাগে। বৃষ্টি চিৎকার দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে। তার ব্লিডিং হচ্ছে। রক্ত দেখে নিরব থেমে যায় ভয়ে তার মাকে ডাকতে শুরু করে। রুনা ছেলের ডাকে জলদি আসে। বৃষ্টিকে দেখে বলে,–” হায়রে এটা কি করে হলো ওরে জলদি হাসপাতালে নিয়ে চল নয়তো তুই জেলে থাকবি।”
নিরব ভয়ে মা যা বলে তাই করে বৃষ্টিকে নিয়ে হাসপাতালে যায়।
—————–
মনি হোটেলে নিরবের জন্য অপেক্ষা করছে। নিরব আসলে তাকে নিয়ে গিয়ে রাদ আর ওর বিয়ের ফেইক ছবি বানাতে হবে। মনি বিরক্ত হয়ে বলে, –” উফফ এই ছেলেটা এখনও আসছে না কেন?”
নিরব আসে ২ ঘন্টা পর। মনি নিরবকে দেখে রাগী গলায় বলে, –” কি সমস্যা এতো লেইট করলে যে?”
নিরবের শরীর ঘেমে একাকার। নিরব তাড়া দিয়ে বলে– ” একটু কাজ পড়ে গেছিলো ম্যাডাম চলুন জলদি।”
মনিও কথা বাড়ালো নাহ। নিরবের সাথে যেতে থাকলো। নিরব একটা স্টুডিও এর সামনে নামল গাড়ি থেকে। মনিও নামলো সাথে। স্টুডিও এর ভিতরে গিয়ে নিরব একটা ছেলেকে জড়িয়ে ধরল। ছেলেটার নাম আকাশ নিরবের বন্ধু। আকাশ বলল,–” কিরে কি মনে করে এখানে?”
নিরব বলল,–” তোকে একটা কাজ করতে হবে। ”
আকাশ বলল,–” কি কাজ বল?”
নিরব বলল,–” তোকে কিছু বিয়ের ফেইক ছবি বানাতে হবে। ”
তরপর নিরব আকাশকে সব বুঝিয়ে বলল। সব শুনে আকাশ বলল,–” আরেহ নো প্যারা সব হয়ে যাবে। ”
অতঃপর নিরব আর মনি একসাথে কিছু ছবি তুলে। বিভিন্ন এঙ্গেলের ছবি তুলে। মনি আকাশকে বলে,–” এডিট করা হয়েছে তা যেন বুঝা না যায়।”
আকাশ বলে,–” চিন্তা করবেন নাহ ম্যাডাম সব হয়ে যাবে। ”
মনি বলল,–” কবে পাবো?”
আকাশ বলল,–” কালকেই। ”
তারপর নিরব মনি কিছুক্ষণ আকাশের সাথে গল্প করে সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। মনির মনে মহা আনন্দ রাদকে সে কখনো শান্তিতে থাকতে দিবে না।


পর্ব  ১২


**** বৃষ্টি হাসপাতালে ভর্তি জ্ঞান ফিরেছে তার। তবে হেটে যাওয়ার মতো সুস্থ ও নয়। বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেছে তার। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে তখন সেখানে তন্নি আর রাদ আসে। হাজার রাগ থাকলেও বৃষ্টির এমন একটা খারাপ খবর শুনে বসে থাকতে পারেনি তন্নি তাই ছুটে চলে এসেছে।
তন্নিকে দেখে বৃষ্টি হাসে। তন্নি অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে মেয়েটা শুকিয়ে গেছে। সন্তান হারানো স্বামী হারানোর থেকে কষ্টের বলে মনে করে তন্নি। স্বামী হারালে সন্তানের মুখ দেখে বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু সন্তান হারালে কি করবে?
তন্নি বৃষ্টির পাশে বসতেই বৃষ্টি হালকা হেসে বলে, –” দেখ তন্নি তোর সাথে করা অন্যায়ের শাস্তি দিয়েছে আমাকে। আমি আরো শাস্তি পাওয়ার যোগ্য দেখ না যাকে ভালোবেসে তোর সাথে বেইমান করলাম সে ও তার মা আমাকে হাসপাতালের বেডে রেখে চলে গেছে। ”
তন্নির খারাপ লাগছে বৃষ্টির জন্য। মেয়েটার তার কর্মফল পেয়েছে এর থেকে বড় শাস্তি আর কিছু হতে পারে না। তন্নি বৃষ্টির হাত ধরে বলে, –” আমার তোর উপর কোনো রাগ নেই।”
বৃষ্টি বলল, — ” জানিস তন্নি আমি নাহ চেষ্টা করেছি সংসারটা বাঁচাতে কিন্তু অন্যের সংসার ভেঙ্গে সংসার করলে যা হয় আর কি।”
তন্নি বলল,–” তুই তো এমন ছিলি নাহ তোকে তো কেউ কিছু বলতে গেলে তাকে নাকানিচুবানি খাওয়াতি।”
বৃষ্টি হাসলো হালকা। হাসিটায় ছিল একরাশ চাপা কষ্ট। তন্নির দিকে তাকিয়ে বলল,–” জানিস যখন জেনেছি আমি মা হতে যাচ্ছি অনুভূতিটা অন্যরকম ছিল তোকে বোঝাতে পারবো না। তখন ভাবলাম সব বাদ দিবো ভালো মেয়ের মতো সংসার করবো। যখন আমি সংসারে মন দিলাম তখন আমার স্বামী সরি নিরব তখন মনে করলো তোকে ছাড়া সে অসম্পূর্ণ। তোকে পেতে সে এখন উঠে পড়ে লেগেছে মনিকে এনেছে কে সে জানি নাহ। ”
তন্নি রাদের দিকে তাকায়। রাদ তন্নির দিকে তাকিয়ে কিছু ইশারা করে। তন্নিও মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়।
————-
মনি আজ রাদের বাসায় যাবে। প্রিপারেশন নিচ্ছে যেন সেখানে কোনো ভুল না হয়। নওরব তার পাশে বসে মনিকে দেখছে আর বলছে কিভাবে সে তন্নির সামনে অভিনয় করবে। মনি বারকয়েক অভিনয় করে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে নিরবের দিকে তাকিয়ে বলে– ” অভিনয় পারফেক্ট হচ্ছে তো?”
নিরব বলে,–” একদম পারফেক্ট হচ্ছে এভাবে অভিনয় করলে তন্নি বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে। ”
মনি হাসে। নিরব হঠাৎ মনে পড়ে বৃষ্টির কথা সে জলদি তার মাকে কল দেয় এই মেয়ে যদি পুলিশ কমপ্লেইন করে তাহলে মা ছেলে দুজনকেই জেলে যেতে হবে। মনির পাশ থেকে উঠে নিরব বারান্দায় চলো যায় ফোন নিয়ে। রুনা ফোন ধরতেই নিরব বলে ওঠে, –” বৃষ্টি কোথায়? ”
রুনা চমকে বলেন,–” হাসপাতালে কেন?”
নিরব বলল,–” তুমি কোথায়? ”
রুনা বলল,–” হাসপাতালে যাচ্ছি রাস্তায়। ”
নিরব বিরক্তিতে কপাল কুচকে ফেলল। দাঁতে দাঁত চিপে বলল– ” মা তুমি এমন বোকামি কি করে করতে পারো ও যদি এখন পুলিশ স্টেশনে চলে যায়। ”
রুনা বললেন,–” কি বলিস আমি বুঝতে পারিনি রে।”
নিরব কিছু বলল না। রুনা বুঝতে পারলেন তার করা ভুলের জন্য ছেলের রাগ হয়েছে। রুনা বললেন, –” চিন্তা করিস নাহ আমি হাসপাতালে গিয়ে ফোন দিচ্ছি। ”
নিরব ছোট করে উত্তর দিল, –” হুম। ”
তারপর নিরব কল কেটে এসে আবার মনিকে বলল রেডি হয়ে নিতে। মনিও চলে যায় রেডি হতে তাদের আবার ছবি আনতে যেতে হবে
————-
রুনা হাসপাতালে এসে দেখে বৃষ্টি কোথাও নেই। রুনা সারা হাসপাতাল খোঁজে ফেলেছে কিন্তু সে কোথাও বৃষ্টিকে দেখতে পায় না। রুনা ভয় পেয়ে যান। সে জলদি নিরবকে কল দেয়। নিরব সাথে সাথে কল রিসিভও করে। নিরব বলে,–” হ্যা মা বলো।”
রুনা একটা ঢুক গিলে ভয়ে ভয়ে বললেন, –” বাবা আমি বৃষ্টিকে পাচ্ছি নাহ।”
নিরব চিৎকার দিয়ে বলে, –” হোয়াট!”
রুনা আবারও বললেন, –” হাসপাতাল পুরোটা খোজেছি কোথাও নেই সে।”
নিরব চিন্তায় পড়ে গেল কোথায় গেল মেয়েটা। পুলিশ স্টেশন যায় নি তো। এদিকে রুনাও চিন্তায় আছেন বৃষ্টি পুলিশ স্টেশন চলে যায় নি তে। তাহলে তো উনাকে আর নিরবকে জেলে যেতে হবে ভয়ে শুকনো ঢুক গিলল। ব্যাগ থেকে পানির বোতলটা বের করে ঢকঢক করে খেয়ে নিল।
————–
নিরব এবং রুনার ধারণা একদম ঠিক বৃষ্টি পুলিশ স্টেশনে গেছে। বর্তমানে সে পুলিশ অফিসার রওনক এর সামনে দাড়িয়ে আছে। বৃষ্টি তাকে সব বলল। সব শুনে রওনক বললেন,–” আপনার বিয়ে হয়েছে কতদিন? ”
বয়সে বাবার সমান লোকের কাছ থেকে আপনি সম্বোধন পেয়ে কিছুটা আনইজি ফিল করে। পরক্ষনেই নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে, –” জ্বি তিন মাস হবে প্রায়।”
রওনক বুঝলেন। বৃষ্টি ওর কাছে কিছু ই লুকাইনি বরং তার অন্যায় গুলো সহ তুলে ধরেছে। রওনক আবার জিজ্ঞেস করলেন, –” এখন আপনার স্বামী অর্থাৎ নিরব কোথায় আছে? ”
বৃষ্টি কিছুক্ষণ ভেবে বলল,–” সে কোথায় আছে জানি নাহ কিন্তু আমার শ্বাশুড়ি কোথায় আছে আমি জানি।”
রওনক বললেন, –” ওকে চলুন। ”
রওনক আর বৃষ্টি বেরিয়ে পড়ল হাসপাতালের দিকে। বৃষ্টির মাথায় এখন একটাই চিন্তা যে পাপ সে করেছে তার প্রায়শ্চিত্ত সে করবে নিরবের থেকে দূরে চলে যাবে। নিরব যেই পাপ করেছে তার শাস্তি তাকে পেতেই হবে।
————-
মনিকে নিরব রাদের বাসার সামনে নামিয়ে চলে যায় হাসপাতালে। মনি সকল প্রমাণ নিয়ে রাদের বাসায় ঢুকে। আজ অফিস ছুটি থাকায় রাদ বাসাতেই আছে। তন্নি দুপুরের খাবার রান্না করে আর রিধি তাকে হেল্প করছে যদিও তন্নি নাহ করেছে অনেকবার যে তার হেল্প লাগবে নাহ।
নিরব ল্যাপটপে বসে কাজ করছিল রাইদা তার পাশে বসে তার ফোনে কার্টুন দেখছিল। তখন হঠাৎ সেখানে মনি ঢুকে বলে,–” রাদ।”
আচমকা নিজের নাম শুনে সামনে তাকিয়ে চমকে যায় রাদ। মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয় মনি নামটি। তন্নি ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে সে। মনি দৌড়ে এসে রাদকে জড়িয়ে ধরে রাদ বিরক্ত হয়ে মনিকে ছাড়িয়ে বলে,–” তুমি এখানে কেন এসেছো?”
মনি আবারও রাদের কাছে ঘেঁষে বলে,–” ওমা আমি আমার স্বামীর কাছে আসবো না এছাড়া এখানে আমার সন্তান আছে। ”
তন্নি রান্নাঘর থেকে বের হয়ে সোফায় এসে বসে মনিকে জিজ্ঞেস করে, –” সন্তান মানে? ”
মনি চোখে পানি নিয়ে রাইদার দিকে তাকায়। রাইদা পিটপিট করে দেখে যাচ্ছে সবাইকে সে বোঝার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে। মনি গিয়ে রাইদাকে কোলে তুলে বলে, –” এই যে এই হলো আমার আর রাদের মেয়ে রাইদা।”
রাইদা অপরিচিত কারো কোলে উঠে সে কি কান্না। মনিকে চিমটি দিতে থাকে যেন তাকে নামিয়ে দেয়। অবশেষে বাদ্য হয়ে মনি তাকে নামিয়ে দেয়
রিধি দাড়িয়ে দেখছে এই মেয়েকে বিরক্ত লাগছে তবে ভাই না করাই সে কিছু বলছে না নয়তো সেও নাকানি চুবানি খাইয়ে ছাড়তো এই মেয়েকে।
তন্নির কোলে গিয়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে রাইদা। তন্নি রাইদাকে নিজের কোলে নিয়ে মনিকে জিজ্ঞেস করে, –” আপনি যে উনার ওয়াইফ তার কি প্রমাণ? ”
মনি যেন এতক্ষণ এই প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করছিল। ব্যাগ থেকে সেই বানানো ছবি গুলো বের করে তন্নিকে দিলো। তন্নি ছবি গুলো দেখে রাদের দিকে তাকিয়ে বলে– ” আপনি আমার সাথে চিট করলেন। ”
তন্নির এই কথায় মনি সবার আড়ালে হাসে। রাদ চমকে উঠে তন্নি তাকে ভুল বোঝবে নাতো। রাদ তাড়াহুড়ো করে বলে,–” না না মিসেস তন্নি আমি চিট করে নি মনি আমার ওয়াইফ নয় আর রাইদা তো…..
রাদকে পুরোটা বলতে না দিয়ে মনি বলে উঠে, –” আমাদের সন্তান রাদ প্লিজ ক্ষমা করে দাও আমি আর কখনো তোমায় ছেড়ে যাবো না কোথাও।”
তন্নি কান্না করে বলে,–” আই হেট ইউ রাদ।”
তন্নি কান্না করে উপরে চলে যায়। রাদও তার পিছন পিছম যায়। রিধি চোখ পাকিয়ে মনির দিকে তাকিয়ে বলে–” গেস্ট রুমে গিয়ে বসো।”
রিধি রাইদাকে নিয়ে চলে যায়। মনি মনে মনে খুশি হয় তার প্ল্যান সকসেস হচ্ছে। সে নিজের ব্যাগ নিয়ে গেস্ট রুমে চলে যায়। তন্নির জন্য তার বড্ড মায়া হচ্ছে আহারে মেয়েটা বার বার কষ্টই পাচ্ছে।


শেষ পর্ব



**** রাদ আর তন্নি বেলকনিতে বসে আছে। তন্নি রাগী ভাব নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে আর রাদ তার দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে। তন্নি আর রাদ একে অপরের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে হেসে দেয়। রাদ হাসতে হাসতে বলল,–” যা অভিনয়টা করলে মিসেস তন্নি।”

তন্নি একটা ভাব নিয়ে বলে,–” সিনেমার নায়কারা হার মানবে তাই নাহ।”

রাদ হেসে বলে,–” ইয়াহ।”

তন্নি নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে,–” ভাগ্যিস আপনি ঐদিন ক্যান্টিনে গিয়ে সব বলেছিলেন। ”

বিয়ের আগে যখন তন্নি গিয়ে রাদকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল তখন রাদ ওকে কিছু কথা বলবে বলে তন্নিকে নিয়ে ক্যান্টিনে গিয়েছিল। সেখানে বসেই রাদ তন্নিকে তার জীবনের সব সত্যি বলে দিয়েছিল। রাইদা ওর সন্তান নয় বরং ওর বড় ভাইয়ের। মনির ব্যাপারেও বলেছিল সে। সব জানিয়ে সে তন্নিকে জিজ্ঞেস করে, –” মিস তন্নি আপনি কি আমার মিসেস তন্নি হবেন?

সেদিন তন্নি রাদের হাত ধরে হ্যা উত্তর দিয়েছিল। তন্নি হাসতে হাসতে বলে,–” আপনার এক্স মনি আস্ত একটা বলদ।”

রাদ হেসে দিয়ে বলল,–” হ্যা নয়তো বুঝে যাওয়ার কথা আমার রিয়েকশনে।”

তন্নি হালকা মায়া দেখিয়ে বলে,–” না থাক নাহ বেচারি এতো কষ্ট করে ঘটনা গুলো সাজিয়েছে কি করে আমি এগুলো ব্যস্তে দেই।”

রাদ কিছু বলতে নিবে তখনই কারো পায়ের শব্দ শুনতে পায়। রাদ তন্নির সাথে ঝগড়ার অভিনয় করতে থাকে। এমন যে তন্নি রাগ দেখাচ্ছে সে তার রাগ কমানোর চেষ্টা করছে। ওদের সন্দেহ সত্যি ছিল মনি এসেছে। রাদ মনিকে দেখে বিরক্ত হয়ে বলে,–” কি এখানে কি চায়? গেট লোস্ট।”

মনি ন্যাকা ন্যাকা ভাব নিয়ে কান্না করার মতো অবস্থা নিয়ে রাদকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। এবার তন্নির সহ্য হলো নাহ এই নিয়ে ৩ বার জড়িয়ে ধরেছে তার বরকে। মনিকে টেনে এক থাপ্পড় লাগায়। মনি গালে হাত দিয়ে চোখ পাকিয়ে তন্নির দিকে তাকায় তন্নি দাঁতে দাঁত চিপে বলে,–” তুই রাইদার মা তাই নাহ রাদের বউ। মানে তুই যা বলবি তা বিশ্বাস করে নিবো আর আমার বরকে ছেড়ে দিব ভাবলি কি করে?”

মনি অবাক হয়ে বলল,– মানে?”

যেই আকাশের কাছ থেকে ছবি গুলো বানিয়ে এনেছিস সে আমাকে বলেছে আর যেদিন তুই বাংলাদেশে এসেছিস সেদিনই তোর আসার খবর পেয়ে গেছি আর তোর আর রাইদার ব্যাপারে আমাকে আগেই বলে দিয়েছে রাদ। বিকেল অব্দি সময় দিলাম বেরিয়ে যা এই বাসা আর আমাদের জীবন থেকে। ”

মনি তন্নির কথাকে পাত্তা না দিয়ে রাদকে বলে,–” প্লিজ রাদ আমাকে গ্রহণ করে নাও আমি আর কখনো ছেড়ে যাবো না।”

রাদ নিজেকে কন্ট্রোল করে বলে, –” মনি চলে যাও তোমার মতো মেয়ের মুখটাও দেখতে চাই নাহ আমি। যদি এরপরও জ্বালাতে আসো তাহলে আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো।”

মনি আর কিছু বলে না সে বুঝে যায় তার রাদকে পাওয়া হবে না। এখানে কারো দোষ নেই সে নিজের দোষে রাদকে হারিয়েছে। মনি গেস্টরুমে চলে যায় নিজের ব্যাগ গুছাতে থাকে। মনির পিছনে রাদ তন্নিও আসে। মনি ব্যাগ গুছিয়ে এসে রাদের সামনে দাড়িয়ে বলে, –“ক্ষমা করে দিও তোমার সাথে অন্যায় করার জন্য তোমাকে মিথ্যে অপবাদ দেওয়াই তুমি খুব লাকি রাদ তন্নির মতো মেয়ে পেয়েছো। আমি চাইলে ঝামেলা করতে পারতাম কিন্তু এতে না তোমরা সুখে থাকতে পারবে না আমি এর থেকে ভালো বরং নিজের জীবনটা আবার শুরু করে।”

তন্নি নিজেকে সামলে নিয়ে মনির কাছে গিয়ে বলে,–” সরি নিজের খেয়াল রেখো আর কখনো অন্যের ক্ষতি করতে যেও না।”

মনি রাদ আর তন্নির দিকে তাকিয়ে বলে– ” ভালো থেকো আসি আমি।”

মনি চলে যায়। যাওয়ার আগে রাদকে আবার দেখে যায় পিছন ঘুরে তারপর আর পিছন ঘুরে না। মনি চলে যেতেই রিধি এসে নাচতে নাচতে বলে,—” ইয়াহু আপদ বিদায় হয়েছে। ”

পরক্ষণেই আবার মন খারাপ করে বলে,–” দূর ভাবছিলাম কয়েকদিন মনিকে নাকানিচুবানি খাওয়াবো এতো দেখি ৫ ঘন্টায় বিদায় নিল।”

তন্নি রিধির কথায় হালকা হাসলো। রিধির কাধে হাত দিয়ে বলে,–” ডিয়ার ননদিনী নিধি তো ইচ্ছে করে যায় নি বাধ্য হয়েছে। ফাঁদে পড়ে সে নিজের ভুলটা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। ”

রিধি বুঝতে না পেরে বলল,–” কিভাবে? ”

তারপর তন্নি তাকে পুরোটা বলতে শুরু করলো।কিছুক্ষণ আগে মনি যখন গেস্টরুমে যায় তখন তন্নি ওর পিছনে পিছনে যায়। মনি রুমে ঢুকে দরজা লক করে দেয়। তখন তন্নি জানালার সাইডে গিয়ে দাঁড়ায়। মনি ফোন বের করে নিরবকে ফোন দেয় কিন্তু নিরব ফোন ধরে না। মনি বিরক্ত হয়ে বলে, –“এই ছেলে কোথায় হারিয়ে গেছে উফ বিরক্তিকর। ”

তখন আবার ফোন দেয় মনি নিরবকে। এবার সাথে ফোন ধরে। আর অপর পাশের লোকটার কথায় জানতে পারে যে নিরবকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

—————-
বৃষ্টি এখনও হাসপাতালে বসে আছে। হাতে হাসপাতালের ছাড়পত্র। কিছুক্ষণ আগেই নিরব আর তার মাকে পুলিশ নিয়ে গেছে। বৃষ্টি এবার কি করবে ভাবছে মা বাবার কাছে সে কখনো যাবে না। কোন মুখেই বা যাবে সে। কতই মা বড় মুখ করে বলেছিল সে যে নিরব তাকে ভালোবাসে।

বৃষ্টি উঠে দাড়ায় এখানে বসে থাকলে কিছু হবে না। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যায়। কি করবে সে কোথায় কাজ খুজবে। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সে তখন ফোনটা বেজে ওঠে। ফোন হাতে নিয়ে দেখে মিশমি কল দিয়েছে। বৃষ্টি ফোনটা রিসিভ করে বলে,–” আসসালামু আলাইকুম আন্টি।”

মিশমি সালাম নিয়ে বললেন, –” কোথায় তুই তন্নি ফোন দিয়ে বলল তুই আসছিস তাই তো তোর প্রিয় খাবার বানিয়ে রাখলাম। ”

বৃষ্টি কিছু না বলে চুপ করে থাকে। মিশমি ধমকে বলেন,–” তোর আঙ্কেল না খেয়ে বসে আছে তুই আসলে তবে খাবে জলদি আয় বাসায়।”

বৃষ্টি বলল,–” আমি আসছি কিছুক্ষণের মধ্যে তুমি আঙ্কেলকে খেতে দাও।”

মিশমি আর কিছু বলে না ফোন কেটে দেয়। বৃষ্টি অন্যায় করলেও তার শাস্তি সে পেয়েছে মেয়েটা এখন যে পরিস্থিতিতে আছে তার মানসিক সাপোর্ট প্রয়োজন। তাই তারা বৃষ্টিকে ক্ষমা করে দিয়েছে।

বৃষ্টি কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় ফিরে। বৃষ্টিকে বাসায় ফিরতে দেখেই মিশমি উঠে রান্না ঘরে চলে যায় খাবার আনতে। তুষার সাহেব গিয়ে বৃষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে– ” যাহ ফ্রেশ হয়ে আয়। “.

বৃষ্টি আর কিছু না বলে মাথা নাড়িয়ে চলে যায় তন্নির রুমে। তন্নির একটা জামা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে। বৃষ্টির মনে অপরাধ বোধ কাজ করছে। যাদের সাথে এতো অন্যায় করেছে তারাই তাকে আবার আপন করে নিয়েছে। আর তার মা বাবা তো এ কয়দিনে একটা বার ফোন ও দেয় নি। বৃষ্টি হাসে নিজের ওপর।

—–
খাবার খেতে বসেছে বৃষ্টি, মিশমি আর তুষার সাহেব। বৃষ্টির গলা দিয়ে খাবার নামছে না বিষয়টা তুষার সাহেব খেয়াল করে বলেন,–” কিরে মা খাচ্ছিস নাহ যে?”

বৃষ্টি কান্না করতে করতে বলে,–” প্লিজ আঙ্কেল আমাকে মা ডেকো না এই ডাকের যোগ্য নই।”

তুষার সাহেব বললেন, –” দুর পাগলি মেয়ে তুই তো তোর ভুল বুঝতে পেরেছিস। তোর সব অন্যায় ক্ষমা করে দিয়েছি সেই কবে।”

মিশমি বললেন, –” মা বাবা কি সন্তানের প্রতি রাগ করে থাকতে পারে। ”

বৃষ্টির চোখে পানি চলে আসলো কাঁদতে কাঁদতে বলল,–” আমায় ক্ষমা করে দাও তোমরা।”

তুষার সাহেব মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে– ” হয়েছে তো অনেক কেঁদেছিস এবার খেয়ে নে।”

বৃষ্টিকে মুখে তুলে খাইয়ে দেয় তুষার সাহেব। যখন থেকে বৃষ্টিকে চিনে নিজের সন্তানের মতোই তো আগলে রেখেছে তাকে। তন্নিকে আর তাকে কখনো আলাদা মনে করে নি তারা।

——————-
রুমে তন্নি আর রাদ বসে আছে। রাইদা অনেক আগেই ঘুমিয়ে গেছে। তন্নি কিছু একটা বলতে চাইছে রাদকে কিন্তু বলতে পারছে নাহ
রাদ বুঝতে পেরে বলে,–” মিসেস তন্নি আমাকে কি কিছু বলবে তুমি?”

তন্নি হাত মুচড়াতে মুচড়াতে বলে,–” ইয়ে মানে আসলে…”

রাদ হেসে বলল,–” তুমি এতো নার্ভাস হচ্ছো কেন?”

তন্নি অসহায় গলায় বলে, –” আমি কিছু বলতে চাই আপনাকে।”

রাদ বলে,–” বলো কি বলবে? ”

তন্নি পাশে থাকা গ্লাসের পানি পুরোটা এক ঢুকে খেয়ে ফেলে। তার গলা শুকিয়ে আসছে মনের কথা বলতে চাই সে রাদকে। বলতে চায় এ কয়দিনে রাদের সাথে থেকে তাকে ভালোবেসে ফেলেছে। তন্নি নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে বলে,–” ভালোবাসি রাদ সাহেব ”

রাদ অবাক হয়ে তাকায় তন্নির দিকে। তন্নি লজ্জায় মুখ লুকায় রাদের বুকে।

১১ মাস পর
হসপিটালে ওটির সামনে দাড়িয়ে দাড়িয়ে আছে রাদ,মিশমি, রিধি, রাইদা, তুষার সাহেব, বৃষ্টি আর বৃষ্টির হাসবেন্ড সয়ন। বৃষ্টিকে আবার বিয়ে দেয় মিশমি আর তুষার। সয়ন ছেলেটা ভীষণ ভালো এবং ভদ্র একটা ছেলে। আজ তন্নির ডেলিভারি তাই সবাই হাসপাতালে। রাদ এদিক ওদিক পায়চারী করছে আর পাগলামো করছে চুল গুলো এলোমেলো হয়ে গেছে চোখ গুলো লাল হয়ে আছে সে ভয় পাচ্ছে তন।নিকে হারিয়ে ফেলার। কিছু ক্ষণ পরে একজন নার্স বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে। সাথে ডাক্তার ও আসে। ডাক্তার রাদকে বলে,–” কংগ্রেস মিস্টার রাদ আপনার ছেলে হয়েছে। ”

রাদ খুশি হয়ে যায়। রিধি গিয়ে বাচ্চাকে নার্সের কোলে নেয়। রাদ ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে, –” আমার ওয়াইফ কেমন আছে? ”

ডাক্তার বলল,-” ভালো আছে একটু পর কেবিনে দেওয়া হবে।”

——–
তন্নি চোখ বন্ধ করে বসে আছে। তার পাশেই দোলনায় বাবুকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। রাদ এসে তন্নি আর বেবির মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটায় বসে। রাদ এসেছে বুঝতে পেরে তন্নি চোখ খুলে। রাদ বলে,–” এখন কেমন লাগছে।?”

তন্নি বলল,–” ভালো বেবিকে দেখেছো?”

রাদ মাথা নাড়িয়ে বলে হ্যা। তন্নি বলল,–” একদম তোমার মতো হয়েছে তাই নাহ।”

রাদ মাথা নাড়িয়ে বলল,–” নাহ একদম আমাদের মতো।”

তন্নি হাসলো রাদ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলো। তন্নি বলল,–” পাগলামি করছিলে কেন?”

রাদ বলল,–” তুমি যে আমার খুশি ভয় হচ্ছিল হারিয়ে না ফেলি।”

তন্নি বলল,–” পাগল। ”

রাদ শক্ত করে তন্নির হাতটা নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। তন্নি রাদের দিকে তাকালো এই লোকটা ছাড়া সে অসম্পূর্ণ। ওকে আকড়ে বাঁচতে চায় সারাজীবন। রাদ তন্নির দিকে তাকিয়ে কপালে আর ঠোঁটে চুমু খেলো। সে যেন তার প্রাণকে ফিরে পেয়েছে।

সমাপ্ত

NEXT

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন