পর্ব ৪
*** তন্নি রেডি হচ্ছে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার জন্য রাদ ফ্যাশন ডিজাইন কম্পানিতে তাকে ডাকা হয়েছে। তন্নি রেডি হয়ে তার বাবার রুমে যায়।
তুষার সাহেব নিজের রুমে বসে সকালের খবরের কাগজ পড়ছিল তখন তন্নি এসে দরজায় নাড়া দিয়ে বলে,–” বাবা আসবো?”
তুষার সাহেব নিজের মেয়েকে দেখে খবরের কাগজটা ভাঁজ করে পাশে রেখে বলেন,– ” আয় মা।”
তন্নি এসে তার বাবার পাশে বসল। তুষার সাহেব নিজের মেয়েকে একবার দেখলেন অনেকদিন পর যেন সে তার মেয়েকে স্বাভাবিক দেখছে খুশিতে চোখে পানি চলে আসে। তন্নি তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলে–” বাবা ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি দোয়া করো।”
তুষার সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন– ” টেনশন হচ্ছে? ”
তন্নি মাথা নাড়িয়ে বলে,–” একটু একটু।”
তুষার সাহেব হালকা হাসলেন তিথুনি টেনে বললেন,–” চিন্তা করিস নাহ চাকরি হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ । ”
তন্নি তার বাবার দিকে তাকিয়ে হাসলো তখন পায়েসের ছোট প্লেট হাতে নিয়ে তারাহুরো করে রুমে ঢুকলেন মিশমি। প্লেটের পায়েসটা ঠান্ডা করতে করতে এক চামচ তন্নির মুখের সামনে ধরে বলেন,–” হা কর।”
তন্নি হা করল তার মায়ের কথায়। এভাবে হাফ প্লেট পায়েস শেষ করে তন্নি তার মা-বাবার কাছ থেকে বিদায় নিল।
—————–
১১:৪০ বাজে তন্নি রাদ ফ্যাশন ডিজাইন কম্পানির সামনে দাড়িয়ে। ১২ টায় ইন্টারভিউ শুরু তন্নি নিজের বুকে ফু দিয়ে ভিতরে ঢুকে বুকে হাত দিয়ে দেখে বুক ধুকপুক করছে।
ওয়েটং রুমে বসে আছে তন্নি। মাত্র দুজনকে ভিতরে ডাকা হয়েছে এখানে আরও কয়েকজন আছে ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। তন্নি আশে পাশে তাকাচ্ছে আর শুকনো ঢুক গিলছে জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ নিজে নিজে বিরবির করে বলে, –” আল্লাহ চাকরিটা যেন হয়ে যায়।”
এর মাঝে তন্নির ডাক পরে, –” তন্নি জাহান কে?”
তন্নি দাঁড়িয়ে বলল,–” আমি।”
তন্নিকে ভিতরে যেতে বলে তন্নির মুখটা সাথে সাথে শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে গেলো। বাহির থেকে বোঝা যাচ্ছে সে কতটা নার্ভাস। তন্নি দরজায় নক করে বলে,–” মে আই কাম ইন স্যার?”
রাদ তন্নির ফাইলের দিকে তাকিয়ে বলে– ” ইয়েস কাম ইন।”
তন্নি নিজেকে স্বাভাবিক করতে দুই তিনবার লম্বা শ্বাস নিয়ে ভিতরে ঢুকে। রাদ ইশারায় বসতে বলে তখনও সে ফাইলের দিকে তাকিয়ে আছে। তন্নি ভদ্র মেয়ের মতো বসে যায়। রাদ এবার তন্নির দিকে তাকিয়ে বলে–” তো মিস তন্নি…”
পুরো কথা না বলেই থেমে যায় রাদ। মেয়েটা যে প্রচন্ড নার্ভাস হয়ে আছে তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। নার্ভাস থাকা কালীন যে কোনো মেয়েকে এতোটা কিউট লাগে তা রাদ তন্নিকে না দেখলে জানতই না।
রাদ দু পাশে নিজের মাথা ঝাকিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বসে বলে,–” আপনি কি নার্ভাস ফিল করছেন মিস তন্নি?”
তন্নি চোখ তুলে তাকায় রাদের দিকে হালকা হেসে বলে, –” না স্যার আমি ঠিক আছি।”
রাদ ভ্রু কুচকে বলল, –” আর ইউ সিউর? ”
তন্নি বলল,–” ইয়াহ স্যার।”
রাদ বলল,–” ওকে নার্ভাস হবেন নাহ এটা জাস্ট কিছু ইজি কথা বলবো আপনার মতামত জানবো সেই বিষয়ে। ”
তন্নি হালকা সাহস পেয়ে বলল,–” ওকে স্যার।”
রাদ বলল,–” তাহলে আমরা শুরু করি?”
তন্নি মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। তন্নিকে ডিজাইনের বিষয়ে কিছু প্রশ্ন করা হলো সে সেই প্রশ্নের উত্তর গুলো সুন্দর করে দিল। রাদ মুগ্ধ হলো তন্নির ওরৃতিটা উত্তর শুনে। রাদ বলল,–” আপনি বাইরে গিয়ে বসুন আপনাকে আবার ডাকা হতে পারে। ”
তন্নি মাথা নাড়িয়ে বলল,–” ওকে স্যার।”
তন্নি বাহিরে চলে গেল। তন্নি যাওয়ার সময় তন্নির দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে রাদ আর মনে মনে বলে,–” আর কেউ যেন আপনার থেকে ভালো পারফর্ম করতে না পারে। ”
————-
প্রতিদিন সকালে চা খাওয়ার অভ্যাস রুনার। এতদিন সকালে তন্নি চা করে দিত। তন্নি চলে যাওয়ার পর চা খাওয়া হয়ে ওঠে নি তার আর। আজ সে ভীষণ খুশি ঘরে নতুন বউ এসেছে আজ সে চা খেতে পারবে।
রুনা খুশি মনে বসার ঘরে গেলেন। বসার ঘরে গিয়ে দেখলেন বৃষ্টি পায়ের উপর পা তুলে বসে টিভি দেখছে। রুনাকে দেখে সেই একই ভঙ্গিতে বসে আছে সে। রুনা হালকা হেসে তার পাশে গিয়ে বসলেন। মুচকি হেসে মধুর সুরে বললেন, –“বৃষ্টি মা।”
বৃষ্টি সেই একই ভঙ্গিতে বসে টিভির দিকে তাকিয়ে বলল,–” কি বলবেন তাড়াতাড়ি বলেন।”
এই কথায় খারাপ লাগে রুনার। সব খারাপ লাগা ঝেড়ে দিয়ে আবার মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন,–” আমাকে এক কাপ চা করে দিবে। ”
বৃষ্টি বিরক্ত হয়ে বলে,–” উফ! মা আপনি এতোটাও অচল হয়ে যান নি যে এক কাপ চা করে খেতে পারবেন না। আমি ওসব চা টা বানাতে পারবো না আপনি বানিয়ে নিন।”
রুনা অপমানিতবোধ হলো সাথে তন্নির প্রতি করা কাজের জন্য অপরাধবোধ। তবে অপরাধবোধটাকে মেনে নিতে নারাজ তিনি। তার মতে সে কোনো ভুল করে নি নিজের ছেলের সুখ চেয়েছে আর তার ছেলে বৃষ্টির সাথে সুখে আছে।
রুনা চুপচাপ ওঠে সেখান থেকে নিজের রুমে চলে গেলেন। নিরব রুম থেকে বের হয়ে বসার ঘরে এসে দেখে বৃষ্টি কাজ করছে আর চোখের পানি মুছছে। নিরব চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,–” কি হয়ছে কাঁদছো কেন?”
বৃষ্টি নাক টেনে বলে,–” আমি কাজ করে ক্লান্ত লাগায় একটু টিভি দেখছিলাম তখন মা এসে আমাকে বললেন আমি নাকি জমিদারি করছি এখানে এমন জমিদারি চলবে না। ”
নিরব রেগে গিয়ে বলে,–” কি মা এই কথা বলেছে?”
বৃষ্টি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে। নিরব আরো রেগে বলে,–” দাড়াও আমি জিজ্ঞেস করছি গিয়ে মাকে।”
বৃষ্টি বাধা দিয়ে বলে– ” নাহ পরে তুমি চলে যাওয়ার পর মা আবার আমাকে কথা শোনাবে। ”
নিরব আর কিছু বলে না বৃষ্টির কপালে চুমু দিয়ে রুনার সাথে দেখা না করেই চলে যায় সে। এদিকে রুনা ছেলের জন্য অপেক্ষা করছে কিন্তু ১১ টা বেজে যাওয়ার পরও যখন আসলো না বাহিরে বের হন তিনি। বৃষ্টিকে জিজ্ঞেস করল, –” নিরব চলে গেছে কি?”
বৃষ্টি বলল,–“হ্যা।”
রুনা মন খারাপ করে চলে গেলেন। রুনা নিজের রুমে চলে যেতেই বৃষ্টি বাকা হেসে বলে,–” এই সংসার আমার মুটোয় আনবো।”
—————
তন্নি বসে আছে রাদের সামনে একটু আগে আবার ডাকা হয়েছে তাকে। রাদ নিজের গলা ঝেড়ে তন্নির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, –” স্যালারি কত নিতে চান?”
তন্নি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। রাদ হালকা হেসে বলে,–” ৪০০০০ হাজার দিলে হবে?”
তন্নি চমকে বলে,–” স্যার আমার চাকরিটা কি হয়ে গেছে? ”
তন্নির এমন বোকা প্রশ্নে রাদ উচ্চস্বরে হেসে দিয়ে বলল,–” হ্যাঁ।”
তন্নি খুশি হয়ে বলল,–” থ্যাংকু স্যার অনেক। ”
রাদ হাসে তন্নিকে মনে ধরে গেছে তার শ্যামলা বর্ণের গোল গাল চেহারা মায়াবি চাপ চোখের পাপড়ি পাতলা। সব মিলিয়ে রাদের কাছে পারফেক্ট লাগছে। হঠাৎ রাদের মনে পড়ে যায় রাইদার কথা মুখের হাসিটা চলে গেল। মনের মাঝে যে আশা জাগিয়েছিল ভেঙে দিয়েছে সে।
রাদ এগুলো চিন্তা করছিল তখন সেখানে সজীবের সাথে রাইদা আসে। রাইদা এসেই পাপাই বলে রাদের গলা জড়িয়ে ধরে। রাদও রাইদাকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে। হঠাৎ তন্নির দিকে চোখ যেতেই রাইদা জিজ্ঞেস করে, –” এই আন্টিটা কে পাপাই।”
রাদ বলল,–“ইনি তোমার নতুন আন্টি।”
রাইদা রাদের কোল থেকে তাড়াতাড়ি নেমে তন্নির কাছে গিয়ে বলে,–” চলনা নতুন আন্তি আমরা খেলি।”
রাদ রাগ দেখিয়ে বলে,–” রাইদা আন্টিকে ডিস্টার্ব করো না।”
রাইদা মন খারাপ করে ফেলে। তন্নি রাইদাকে কোলে নিয়ে বলে,–” থাক না স্যার খেলুক আমার সাথে সমস্যা নেই।”
তন্নি আর রাইদা খেলতে থাকে আর রাদ তাদের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আর রিধির বলা কথা গুলো নিয়ে ভাবতে থাকে। তবে সত্যিই কি রাইদার মায়পর আদরের অভাব পরছে? সত্যিই কি তার মা প্রয়োজন? রাদের মাথায় হাজার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
পর্ব ৫
**** রাদ নিজের রুমে বসে আছে। তার চোখে বার বার তন্নির সেই নার্ভাস হওয়া মুখটা ভেসে আসছে। রাদ বিরক্ত হয়ে বলে,–” কি হয়েছে রাদ তোর তুই কেন ওকে ভুলতে পারছিস নাহ তার উপর মেয়েটা ডিভোর্সি রিধি কখনো মানবে না।”
রাদ নিজেকে এগুলো বলে সান্ত্বনা দিচ্ছিল তখন সেখানে রিধি এসে দরজা নক করে বলে,–” ভাই আসবো। ”
রাদ রিধির কন্ঠ শুনে নিজের ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে বলে,–” আয় ভিতরে। ”
রিধি অনুমতি পেয়ে ভিতরে ঢুকে এসে রাইদার পাশে বসে। রাইদা তার ফুপিকে দেখে খুশি হয়ে তার কোলে উঠে বলে, –” ইপ্পি ( ফুপি) তুমি জানো আজ একটা আন্তি আসছে অফিসে। ”
রিধি ইন্টারেস্ট দেখিয়ে বলে,–” তাই! তারপর কি হলো?”
রাইদা তাকে সব বলে। রিধি রাদের দিকে তাকিয়ে বলে– ” কে রে ঐ মেয়েটা?”
রাদ গম্ভীর গলায় বলে –” আমার নতুন পিএ।”
রিধি বলল,–” কেমন দেখতে রে?”
রাদ গম্ভীর গলায় আবারও বলে,–” ওকে আবার বউ বানাতে লেগে যাস নাহ মেয়েটা ডিভোর্সি। ”
রিধি কপাট রাগ দেখিয়ে বলে,–” তো কি হয়েছে তুই কি? সত্যিতে তুই আনম্যারিড হলেও সারা দুনিয়ার সামনে তুই এক বাচ্চার বাপ মানে তুই ম্যারিড ছিলি।”
রাদ ভ্রু কুচকে তাকায় রিধির দিকে। রিধি আবার বলতে থাকে –“এখানে আমি ঐ মেয়েকে তোর বউ বানানোর প্ল্যান করছিলাম নাহ আর শোন কার মনে কি চলে একটু হলেও বুঝি ছোট থেকে দেখছি তো অফিস থেকে আসার পর থেকে লক্ষ্য করছি আমি।”
রাদ ভ্রু আরো কুচকিয়ে বলে,–” মানে?”
রিধি বলে,–” বুঝে নে।”
এই বলে রিধি সেখান থেকে চলে যায় আর রাদ সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। তবে মনে মনে খুশিও হয়েছে ডিভোর্সি শুনে রিধি স্বাভাবিক রিয়েক্ট করেছে। রাদ নিজে নিজে বলতে থাকে, –” এই মনে ধরেছেন আপনি মিস তন্নি আপনাকে যে আমার চাই।”
————-
তন্নি বেলকনির একটা চেয়ারে বসে কফি খাচ্ছে। তখন ফোনে একটা মেসেজ আসে। মেসেজ টা ওপেন করে।
–“ভালোবাসাই নেইকো আর কোনো বাধা,
শুধু তোমার বলার অপেক্ষা
মেসেজটা পড়ে কপাল কুচকে ফেলে তন্নি। কে দিল এই মেসেজ এটা নিয়ে ভাবতে থাকে। তখন বসার ঘর থেকে মিশমি ডাক দিলেন তন্নি। তন্নি কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে চলে যায় বসার ঘরে।
–” মা ডাকছিলে?”
মিশমি বললেন, –” এই নে তোর প্রিয় চিকেন বার্গার এনেছে তোর বাবা। ”
তন্নি খুশি হয়ে বলে,–” সত্যি!”
মিশমি বার্গার তন্নির দিকে এগিয়ে দেন। তন্নি মিশমির থেকে বার্গারটা নিয়ে এসে খেতে শুরু করে। ততক্ষণে তুষার সাহেব হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে।
তন্নি তুষার সাহেবের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে আবার বার্গার খেতে থাকে। তুষার সাহেব ও মেয়ের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসেন। সন্তানকে খুশি দেখলেই তো মা বাবার মনে তৃপ্তি আসে।
———
রাত প্রায় ১২ টা বাজে রুনা নিজের রুমে বসে আছেন নিরব তার রুমে আসবে বলে কিন্তু নিরব আসে না। ছেলেটাকে সারাদিন দেখতে না পেয়ে মনটা চটপট করছে তার। আর থাকতে না পেরে উঠে দাঁড়ালেন সে। নিরবের রুমের দিকে পা বাড়ালেন।
নিরবের রুমের দরজার সামনে দাড়িয়ে আস্তে করে কয়েকটা ঠোকা দিলেন। কেউ এলো না আবার একটু জোরে দিলেন এবার নিরব এসে দরজা খুললো। নিরবকে দেখেই জড়িয়ে ধরে কাদা শুরু করলেন। নিরব চিন্তিত হয়ে বলে,–” কি হয়েছে মা কাদছো কেন?”
রুনা কাদতে কাদতে বললেন, –” তুই সারাদিনে একটা বারের জন্যও আমার কাছে যাস নি।”
নিরব বলল,–” সরি মা আসলে অফিসে যাওয়ার সময় তারাহুরোর জন্য যেতে পারি নাই তোমার কাছে আর অফিস থেকে আসার পর খুব ক্লান্ত লাগছিল। ”
রুনা চিন্তিত হয়ে বলেন, –” খুব খারাপ লাগছে বুঝি যা ঘুমিয়ে পর।”
নিরব বলল,–” আচ্ছা তুমিও যাও আর কেদো নাহ বুঝলে। ”
রুনা মাথা নাড়ালেন ঘুরে চলে আসছিলেন তখন তার কানে ভেসে আসলো বৃষ্টির গলা সেখানে বৃষ্টি নিরবকে বলছে, –” তোমার মায়ের কমন সেন্স নাই এতো রাতে এসে কেউ ছেলে আর ছেলের বউয়ের রুমে টুকা দেয়।”
নিরব বিরক্ত হয়ে বলে, –” ব্যস বৃষ্টি মায়ের ব্যাপারে কিছু বলবে না এখানে দোষটা আমারই।”
বৃষ্টি ন্যাকা কান্না করে বলে, –” হ্যা এখন তো তুমি আমার প্রতি বিরক্ত হবেই আবার অন্য কাউকে পেয়ে যাওনি তো?”
নিরবের বুকটা ছ্যাত করে উঠে বৃষ্টি তাকে কথা শোনালো। এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল নিরবের ভিতর থেকে। বাহিরে থাকা রুনা এসকল কিছু শোনে আচল দিয়ে মুখ ঢেকে চলে যায় নিজের রুমে।
—————————
রাত ১২ ট বাজে একা বেলকনিতে বসে আছে তন্নি। আজকেও চোখের কোণে পানি জমে আছে তার হাতের ফোনে আজকেও নিরবের ছবি ভাসছে। ছবিটির দিকে তাকিয়ে বলে– ” বৃষ্টি কে নিয়ে ভালোই আছো তাই নাহ?”
হাজার কষ্টে নিজের মুখে এক চলতি হাসি ফুটিয়ে তুলে। সারাদিন তার ব্যস্ততার মাঝে গেলেও রাতটায় সে হয়ে যায় ভীষণ একা। সব স্মৃতিগুলো তার মস্তিষ্ককে গ্রাস করতে থাকে।
তন্নি ফোনটা আবার সামনে ধরে চোখের পানি মুছে সে ডিলিট অপশনে চাপ দিয়ে বলে,–” এই ফোনে যতদিন তোমার ছবি থাকবে ততদিন আমি তোমাকে ভুলতে পারবো না।”
নিরবের ছবিটা ডিলিট করে দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নেয় তন্নি। কিন্তু মনের ভার ভার ভাবটা কমে না বরং নিরবের শূন্যতা তাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। সে তো ভুলতে চায় নিরবকে তবে কেন পারে না সে?
——————
রাদ সকাল সকাল কফি হাতে বেলকনির রেলিং এ ভর দিয়ে দাড়িয়ে আছে। এই পরিবেশটা তার কাছে ভালো লাগে এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে। চোখ দুটো বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস নেয়। মনটা যেন সতেজ হয়ে যায়।
রাইদার উঠে যাওয়ার শব্দে তার কাছে ছুটে যায় রাদ। রাইদ বসে কান্না করছে। রাদ অস্থির গলায় বলে,–” কি হয়েছে মা কাদছো যে?”
রাইদা কান্না করে বলে, –” পাপাই আমি মাম্মাহ যাবো।”
রাদ কপাল কুচকে বলে,–” মানে? ”
রাইদা আবারও কান্না করে বলে, –” আমি মাম্মাহ আর বাবাই কাছে যাবো। ওরা এসেছিল আমার কাছে। ”
রাদ আর কিছু বলে না রাইদাকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে। নিজের সেই ভয়ংকর অতীতকে নিয়ে ভাবতে থাকে। কেন হলো তার সাথে এমন?
পর্ব ৬
পর্ব ৬
**** সবার জীবনে কোনো না কোনো ঘটনা থাকে যা তার জীবনে অস্বাভাবিক প্রভাব ফেলে যেমন তন্নির জীবনে নিরবের সাথে বিচ্ছেদ তেমনি রাদের জীবনে এমন কিছু ঘটনা আছে
৩ বছর আগে।
রাদ, রাদের মা নিধি আর বাবা অনিক সাহেব, ছোট বোন রিধি আর বড় ভাই রিদয় আর ভাবি নয়না এই নিয়ে ছিল রাদের পরিবার। রাদ তখন আর্ট কলেজে পড়ছিল। রাদের ভাবি নয়না ৯ মাসের প্র্যাগনেন্ট ছিল।
নিধি রান্নাঘরে দুপুরের রান্না বসিয়েছেন। তার হাতে হাত রিধি সাহায্য করছে। রাদ তখন কলেজে গেছে। নয়না সোফায় মুখ গোমড়া করে বসে আছে। কারণ একটাই কাজ করতে যাওয়ায় নিধি তাকে বকা দিয়েছেন। অনিক সাহেব আর রিদয় তখন অফিসে মিটিংয়ে নিজেদের রুমে ব্যস্ত। নয়না প্র্যাগনেন্ট থাকায় তারা বাসায় মিটিং ডেকেছে যাতে যখন প্রয়োজন হয় যখন তখন যেন তারা থাকতে পারে।
নয়না বসে টিভি দেখছিল হঠাৎ তার পেটে ব্যাথা করতে থাকে অনেক কষ্টে সে নিধিকে ডাক দেয়। নিধি এসে বলেন,–” কি হয়েছে?”
নয়না পেট চেপে ধরে বলল,–” মা আমার পেটে ভীষণ ব্যথা করছে।”
নিধি চিন্তিত গলায় বলে, –” কি বলিস?”
নিধি গিয়ে তাড়াতাড়ি অনিক সাহেব আর রিদয়কে ডেকে আনে। রিধি নয়নাকে শক্তভাবে ধরে রাখে। নয়না ব্যথায় চটপট করছে।
অনিক সাহেব আর রিদয় দৌড়ে নিচে আসে। রিদয় এসে নয়নাকে কোলে তুলে নেয় আর অনিক সাহেব গাড়ি বের করতে চলে যান। নিধি এসে রিধিকে,–” তুই বাসায় থাক খাবার গুছিয়ে তারপর রাদের সাথে আসিস আমি রাদকে বলে দিব তোকে নিয়া যাইতে।”
রিধি কিছু বলে না শুধু মাথা নাড়ায়। নিধি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু খেয়ে চলে যান। রিধি বাড়ির সব কাজ শেষ করে নিজের রুমে গিয়ে বসে।
—————–
রাদ কলেজের বাহিরে বসে বাহিরের এক প্রাকৃতিক দৃশ্য আার্ট করছে তখন সেখানে তার গার্লফ্রেন্ড মনি আসে। রাদ মনির দিকে তাকিয়ে হালকা হাসে সাথে মনিও হেসে বলে, –” ওয়াও কি সুন্দর করেছো!”
রাদ হেসে বলে,–” থ্যাংকস।”
মনি বলে,–” শুধু থ্যাংকস এটা কিন্তু মানা যায় না চল না কোথাও ঘোরতে যাই।”
রাদ আবারও মুখের হাসি বজায় রেখে বলে, –” আজ না মনি আমার অনেক কাজ আছে এখন আমাকে অফিসে যেতে হবে আব্বু আর ভাইয়া ভাবিকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে অফিসে আজ মিটিং ছিল বাকি মিটিং টা আমাকে শেষ করতে হবে। ”
মনি মন খারাপ করে বলে,–” ওকে।”
রাদ নিজের ব্যাগ গুছিয়ে মনির দুগালে হাত দিয়ে বলে,–” মন খারাপ কর না আমি কাল নিয়ে যাবো তোমায় ঘোরতে।”
মনি রাদের মন রাখতে হালকা হাসে। রাদও হেসে বিদায় নিয়ে চলে যায়। অফিসে যাওয়ার মাঝ পথ অব্দি যেতেই রাদের ফোনে কল আসে। দেখে তার বাবা। রাদ ফোন রিসিভ করে বলে, –” হ্যালো বাবা বলো।”
ঐপাশ থেকে অপরিচিত একজন বলে,–” এই ফোনের মালিক আপনার বাবা?”
রাদ চিন্তিত গলায় বলে,–” হ্যা কেন কি হয়েছে? ”
ঐ পাশের ব্যক্তিটা বলল,–” আপনার পরিবারের এক্সিডেন্ট হয়েছে আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি আপনও তাড়াতাড়ি আসুন।”
লোকটা কল কেটে দেয়। রাদ গাড়ি বাসার দিকে ঘোরায় রিধিকে নিয়ে যাবে নয়তে মেয়েটা এতোক্ষণ একা থাকলে ভয় পাবে। কিন্তু রাদের মাথা কিছু কাজ করছে নাহ চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে।
বাসা থেকে রিধিকে নিয়ে রাদ জলদি হাসপাতালে যায়। কিন্তু তাদের মা বাবাকে দেখা আর হলো নাহ। রাদ হাসপাতালে গিয়ে এক নর্সকে জিজ্ঞেস করল, –” একটু আ আগে এক্সিডেন্ট হওয়া পেশেন্ট আসছে তারা কোথায়? ”
রাদের কথা উল্টো পাল্টা হলেও নার্স বুঝতে পারলো জিজ্ঞেস করল, –“আপনারা কারা?”
রাদ বলল,–” ছেলে মেয়ে।”
নার্স মাথা নিচু করে বলে– ” যিনি প্র্যাগনেন্ট ছিল তিনি অপারেশন থিয়েটার এ আছে আর আমরা সরি বাকি তিনজনকে বাচানো সম্ভব হয় নি।”
রিধি সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে বলে,–” না।”
রাদ সেখানেই বসে পড়ে। কি বলবে সে কি করবে ও কোনদিকে যাবে? এক মুহূর্তে কি হয়ে গেল সে যেন মনে হচ্ছে কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখছে।
রাদ উঠে দাড়িয়ে রিধিকে বলে,–” চল আগে অপারেশন থিয়েটারের সামনে। ”
রিধি বলল,–” কিন্তু বাবা মা?”
রাদ বলল,–” ওদের হারিয়ে ফেলছি একজনকে ফিরে পাওয়ার আশা আছে আর ঐখানে আমাদেরকে সবচেয়ে দরকার। ”
রিধি কিছু বলে না রাদ রিধিকে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারের সামনে যায়। ওরা সেখানে যাওয়ার একটু পর ডাক্তার বেরিয়ে আসে। ডাক্তারকে দেখে রাদ ভয়ে কুচকে যায়। রাদকে দেখে ডাক্তার এসে পর ওর কাছে বলে,–” আপনি কি পেশেন্টের বাড়ির লোক?”
রাদের মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না সে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে। ডাক্তার রাদকে এসে বলে,–” আপনি পেশেন্টের কি হন?”
রাদ বলল,–” দে দেবর।”
ডাক্তার এবার মাথা নিচু করে বলে,–” একটা সুন্দর মেয়ে হয়েছে কিন্তু পেশেন্টের অবস্থা ভালো নাহ। আর রাদ কে ওর সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। ”
রাদ বলল,–” আমি রাদ।”
রাদ রিধিকে নিয়ে নয়নাকে যেই কেবিনে দেওয়া হয়েছে সেই কেবিনে গিয়ে ঢুকে। রাদ একটা চেয়ার টেনে নয়নার পাশে বসে।
পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে নয়না চোখ খোলে দেখে রাদ। রাদকে দেখে মুচকি হাসি দিয়ে বলে–, ” রাদ ভাইয়া বাবা মা কোথায়? ”
রাদ মিথ্যা হাসি ঝুলিয়ে বলে,–” ওরা বাসায় গেছে। ”
রাদের এই মিথ্যা শুনে একটু জোরেই হেসে দেয় নয়না। রাদ অবাক চোখে তাকায় নয়নার দিকে। হঠাৎ নয়না রাদের হাত ধরে বলে,–” আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো তুমি ছাড়া আর রিধি ছাড়া আর কেউ নেই দেখে রেখো ভাই।”
এতটুকু বলেই নিস্তেজ হয়ে যায় সে। রাদের হাত থেকে নয়নার হাতটা পড়ে যায়। রাদ আবারও শকড। একদিনে এতোগুলা প্রিয় মানুষ হারালো মানতে পারছে না সে।
